সোমবার, ১ আগস্ট, ২০২২

2023 দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাস বড়ো প্রশ্নোত্তর (সব অধ্যায়) XII - উচ্চমাধ্যমিক

১) ভারতের রেলপথ প্রবর্তনের উদ্দেশ্যসমূহ আলোচনা করো। রেলপথ প্রবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে লেখো।   ৪+৪ 

উত্তর: 

সূচনা :  ঔপনিবেশিক শাসনকালে ভারতে রেলপথের প্রতিষ্ঠা এদেশের অর্থনীতিকে সর্বাধিক প্রভাবিত করেছিল। নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও অন্যান্য প্রয়োজনে ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দের ১৬ এপ্রিল লর্ড ডালহৌসি ভারতে প্রথম রেলপথ স্থাপন করেন। ২১ মাইল দীর্ঘ এই রেলপথ স্থাপিত হয়েছিল মুম্বাই থেকে থানে পর্যন্ত। 

ভারতে রেলপথ প্রবর্তনের উদ্দেশ্যসমূহ : 

(১) সামরিক কারণ :  ভারতের দূরবর্তী স্থানে দ্রুত সেনা বাহিনী প্রেরণ এবং সৈন্যদের প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী ও অর্থ প্রেরণের জন্য রেলপথ স্থাপন ছিল অপরিহার্য।  

(২) যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন :  যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করে বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ও বিকাশ ঘটানো ছিল রেলপথ স্থাপনের অন্যতম উদ্দেশ্য। 

(৩) ব্রিটেনের শিল্প কাঠামোর উন্নয়ন :  রেলপথের মাধ্যমে শিল্প পরিকাঠামোর গঠন করে ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছিল। এর দ্বারা ব্রিটেনের শিল্প কাঠামোকে উন্নত করে তোলা হয়েছিল। 

(৪) ব্রিটিশ পুঁজি বিনিয়োগ :  ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের ফলে প্রচুর সঞ্চিত উদ্বৃত্ত ব্রিটিশ শিল্পপতিরা বিনিয়োগ করে আরও পুঁজি উপার্জন করতে তৎপর হয়ে ওঠে। ভারতে রেলপথ নির্মাণে মূলধন বিনিয়োগ করা তাদের কাছে যথেষ্ট নিরাপদ ও লাভজনক বলে মনে হয়। তারা এক্ষেত্রে ভারতের রেলপথ নির্মাণকে বেছে নেয়। 

(৫) মুনাফা অর্জন :  ভারতে রেলপথ ব্যবস্থা চালু হলে ইঞ্জিন, মালগাড়ি ও রেলপথের সরঞ্জাম বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করতে পারবে বলে মনে করে ব্রিটিশ পুঁজিপতিরা। 

(৬) জরুরী পরিস্থিতির মোকাবিলা :  ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে দুর্ভিক্ষ ছিল নিয়মিত ঘটনা। দুর্ভিক্ষ, মহামারী বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রভৃতি জরুরি পরিস্থিতিকালীন সময়ে যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য রেল পরিবহন খুবই আবশ্যক ছিল। 

(৭) ডালহৌসির উদ্দেশ্য :  লর্ড ডালহৌসি বিশেষ কয়েকটি উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতের রেলপথ স্থাপনের উদ্যোগ নেন। এই উদ্দেশ্যগুলি হল- 

ক) ভারতের দূরবর্তী অঞ্চল গলিতে দ্রুত সেনাবাহিনী পাঠানো।

খ) দেশের শিল্প পরিকাঠামো গড়ে তোলে ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের উদ্যোগকে স্বাগত জানানো। 

গ) রেলপথ স্থাপনের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো।

ঘ) দেশের কাঁচামাল বন্দরগুলিতে পৌঁছানো।

ঙ) উৎপাদিত শিল্প সামগ্রী সহজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া প্রভৃতি।

•• ভারতে রেলপথ প্রবর্তনের প্রভাবসমূহ :  

ঔপনিবেশিক ভারতের অর্থনীতিতে রেলপথ নির্মাণের গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। 

সদর্থক প্রভাব :  ভারতে রেলপথ নির্মাণের সদর্থক প্রভাবগুলি হল - 

(১) যোগাযোগের প্রসার :  ভারতে রেলপথ বিস্তারের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে এক কার্যকর ও তৎপর প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়। ভারতে রেলপথের প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক অগ্রগতি ঘটে।

(২) পরিবহনের উন্নতি :  ভারতে রেলপথ স্থাপনের পর জনগণের যাতায়াত পণ্য চলাচল ইত্যাদি ব্যাপার অনেক সহজ ও সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। অতি দ্রুত মানুষ ও পণ্য চলাচল সম্ভব হওয়ায় দুর্ভিক্ষ ও খরার সময় দূরদূরান্তে খাদ্য পাঠানো সহজ হয়।

(৩) আমদানি বৃদ্ধি :  রেলের মাধ্যমে স্বল্প ব্যয়ে মালপত্র পরিবহন করা সম্ভব হতো। বিলাতের বিভিন্ন শিল্প পণ্য ও বিলাস সামগ্রী ভারতের বন্দরে এসে তা রেলের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে পৌঁছে যায়। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে আমদানির পরিমাণ তিনগুণ বৃদ্ধি পায়।

(৪) শিল্পায়ন :  কার্ল মার্কস বলেছেন যে, রেল ব্যবস্থা ভারতে আধুনিক শিল্পায়নের প্রকৃত অগ্রদূত হবে বাস্তব ক্ষেত্রেও রেলপথের প্রচারের ফলে ভারতের শিল্পের বিকাশের পটভূমি তৈরি হয় রেল ব্যবস্থা স্বল্প ব্যয় কাঁচামালের যোগান দিয়ে এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে পৌঁছে দিয়ে লোহা ইস্পাত কয়লা প্রভৃতি আধুনিক শিল্পের বিকাশে সাহায্য করে।  

(৫) কর্মসংস্থান :  ভারতের রেলপথ স্থাপনের ফলে রেলপথ নির্মাণ, রেল-কারখানা প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। দেশের ভূমিহীন কৃষকরা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে রেলের কাজে নিযুক্ত হয়। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় রেলে নিযুক্ত মোট কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৭৩  হাজার।

(৬) আন্তর্জাতিক বাজার :  আগে আঞ্চলিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে ভারতের কৃষি উৎপাদন চলত রেলপথের প্রচারের ফলে ভারতের কৃষি পণ্য রেলের মাধ্যমে বন্দরে পৌঁছে সহজেই আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার সুযোগ পায়।

(৭) জাতীয় ঐক্য :  রেলের সম্প্রসারণের ফলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায় এবং ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও জাতীয়তাবোধ বৃদ্ধি পায়।

       মার্কিন ঐতিহাসিক বুকানন বলেছেন যে, "স্বনির্ভরতার যে বর্ম ভারতের গ্রামগুলিকে এতদিন রক্ষা করে এসেছিল, ইস্পাতের রেল সেই বর্ম ভেদ করে গ্রাম-জীবনের রক্ত শোষণ শুরু করে দেয়।" 

নঞর্থক প্রভাব :  দাদাভাই নওরোজি, জি ভি জোশি, রমেশচন্দ্র দত্ত, বলগঙ্গাধর তিলক প্রভৃতি জাতীয়তাবাদী নেতা এদেশের রেলপথ নির্মাণের বহু নঞর্থক প্রভাব বা কুফল লক্ষ্য করেছেন। ড: বিপানচন্দ্র বলেছেন যে, "ভারতে রেলপথের প্রবর্তন ভারতীয় জনজীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে।" ভারতে রেলপথ নির্মাণের কুফলগুলি নিম্নরূপ - 

(১) দেশীয় শিল্পের অবক্ষয় :   ইংল্যান্ডে কলকারখানায় উৎপন্ন সস্তা কাপড় ও অন্যান্য পণ্যসামগ্রী রেল পরিবহনের মাধ্যমে ভারতের বাজার কবজা করে নেয়, ফলে ভারতের কুটির শিল্পের অবক্ষয়ের ঘটে। 

(২) বৈষম :  রেলে ভারতীয় যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আচরণ করা হত। শ্বেতাঙ্গ যাত্রীরা ভারতীয় যাত্রীদের লাঞ্ছনা করত। মালপত্র পরিবহনে  শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে ভারতীয়দের বেশি ভাড়া দিতে হতো।

(৩) সম্পদের বহির্গমন :  প্রথম পর্বে রেলপথ নির্মাণে যে বিপুল পরিমাণ মূলধন বিনিয়োগ করা হয়, গ্যারান্টি প্রথার মাধ্যমে সরকার তাতে বার্ষিক পাঁচ শতাংশ সুদ দেওয়ার গ্যারান্টি দেয়। এর ফলে প্রতিবছর সুদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও লাভের মুনাফা বিদেশে চলে যেতে থাকে।

(৪) কর্মসংস্থানে বঞ্চনা :  ভারতের রেলপথের সম্প্রসারণের ফলে রেলের কাজে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। কিন্তু এর উচ্চপদগুলোতে সাধারণত শ্বেতাঙ্গদের নিযুক্ত করা হত। নিম্ন বেতনের শ্রমসাধ্য কাজগুলিতে ভারতীয় অদক্ষ শ্রমিকরা নিযুক্ত হত।

(৫) দুর্ভিক্ষের প্রকোপ :  দুর্ভিক্ষ পীড়িত অঞ্চলে রেলের মাধ্যমে খাদ্য পাঠানোর সহজ তরো হলেও পরোক্ষে এ রেল ব্যবস্থায় আবার দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে।

(৬) এছাড়াও রেল ব্যবস্থার ফলে পরিবেশের ক্ষতি, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্য, রেলব্যবস্থায় ভারতীয় ও ইউরোপীয়দের মধ্যে বৈষম্য ইত্যাদি নেতিবাচক প্রভাব দেখা দেয়। 


২) বাংলায় নবজাগরণের প্রকৃতি অলোচনা করো। এর সীমাবদ্ধতা কী ছিল?    ৫+৩


সূচনা:  অষ্টাদশ শতকে বাংলার সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনকে ঐতিহাসিকগণ নবজাগরণ আখ্যা দিয়েছেন। এইসময় ইংল্যান্ডের মাধ্যমে পাশ্চাত্যের সঙ্গে বাংলার সংস্পর্শের ফলে এই জাগরণ শুরু হয় যা বাংলার সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। ইতালির নবজাগরণের সাথে তুলনা করে অনেকে বাংলার এই জাগরণকে ‘Bengal Renaissance' বা ‘বঙ্গীয় নবজাগরণ' নামে অভিহিত করেছে। 

নবজাগরণ:  উনিশ শতকের মধ্যবর্তী পর্যায়ে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা , জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা, ধর্মীয় উদারতা, সমাজ সংস্কার ও আধুনিক সাহিত্যের বিকাশ শুরু হয় যা উনিশ শতকে বাংলার সমাজ– সংস্কৃতিতে ব্যাপক অগ্রগতি ঘটায়। এই অগ্রগতিকেই ঐতিহাসিকেরা বাংলার নবজাগরণ বলে উল্লেখ করেছেন। 

নবজাগরণের প্রকৃতি ও চরিত্র :  বাংলার নবজাগরণের চরিত্র বিচারে পাশ্চাত্যের উদারপন্থী ভাবধারা, প্রাচ্যের পুনরুজ্জীবনবাদ বা ঐতিহ্যবাহী ভাবধারা এবং সমন্বয়বাদী ভাবধারার পরিচয় লক্ষ করা যায়। নবজাগরণের প্রকৃতি ও চরিত্র বিচার সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত রয়েছে- 

ক) বাংলার নবজাগরণ প্রকৃত নবজাগরণ :  রাজা রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ মনীষী উনিশ শতকের বাংলার মানসিক স্ফুরণ ও সংস্কার আন্দোলনকে নবজাগরণ বলেছেন। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার তাঁর 'বাংলার ইতিহাস' গ্রন্থে উনিশ শতকের বাংলাকে 'নবজাগরণের পীঠস্থান' বলে অভিহিত করেছেন। অধ্যাপক সুশোভন সরকারও এ বিষয়ে সহমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ব্রিটিশ শাসনে বুর্জোয়া অর্থনীতি ও আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব অনুভূত হয়। ফলে যে সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটে তাকে সাধারণভাবে 'নবজাগরণ' বলা হয়ে থাকে। 

খ) বাংলার নবজাগরণ প্রকৃত নবজাগরণ নয় :  পন্ডিত অশোক মিত্র ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারির সময় বাংলায় উনিশ শতকের জাগরণকে 'তথাকথিত নবজাগরণ' বলেছেন। গবেষক সুপ্রকাশ রায় বাংলার নবজাগরণকে ইউরোপের থেকে ভিন্ন সামন্ততান্ত্রিক ভূস্বামীদের আন্দোলন বলেছেন। ইউরোপের নবজাগরণ ছিল সামন্ত প্রথার বিরুদ্ধে কিন্তু বাংলার নবজাগরণ ছিল জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সাথে একত্রিত হয়ে সামন্ততান্ত্রিক ভূস্বামীদের আন্দোলন। ঐতিহাসিক বিনয় ঘোষ একে একটি ঐতিহাসিক প্রতারণা বলে অভিহিত করেছেন।

শহরকেন্দ্রিকতা :  বাংলার এই নবজাগরণের প্রভাব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিল কলকাতানির্ভর, কখনো তা পার্শ্ববর্তী শহরতলিতে কিছুটা দেখা গেলেও সমগ্র বাংলা জুড়ে এর কোনো প্রভাবই লক্ষ করা যায়নি। 

সরকারপ্রীতি :  উনিশ শতকের এই নবজাগরণের সঙ্গে যুক্ত বেশিরভাগ ব্যক্তি বা ব্যক্তিবিশেষ সামাজিক সংস্কারেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। কিন্তু তাঁরা ভারতবর্ষের স্বাধীনতার বিষয়ে চিন্তিত ছিলেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বললেই চলে। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার লিখেছেন— “ইংরেজদের দেওয়া সবচেয়ে বড়ো উপহার হলো আমাদের উনিশ শতকের নবজাগরণ।” তিনি ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠাকে এজন্য ‘গৌরবময় ভোর’ বলে উল্লেখ করেছেন। 

সীমাবদ্ধতা :  বাংলার এই নবজাগরণ কেবলমাত্র মধ্যবিত্ত ও কিছু ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় এই আন্দোলনকে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হয়। জওহরলাল নেহরুর মতে, ঔপনিবেশিক শাসনের জ্ঞানদীপ্তি শুধু উচ্চবর্গের হিন্দুদের ওপরই প্রতিফলিত হয়েছিল। সাধারণ জনগণের মধ্যে এর বিশেষ প্রভাব পড়েনি। 

   মূলত মূলত ব্রিটিশ সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে বাংলায় নবজাগরণ এসেছিল। নবজাগরণের নেতৃবৃন্দ মনে করতেন যে, ইংরেজ শাসনই ভারতীয় সভ্যতার সার্বিক মঙ্গল করতে পারে। 

হিন্দু জাগরণবাদ :  বাংলার নবজাগরণ প্রকৃতপক্ষে হিন্দু জাগরণবাদে পর্যবসিত হয়। তাই অনেকে মনে করেন যে উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের ভূমিকা ছিল খুবই গৌণ। 

নবজাগরণের গুরুত্ব :  উনিশ শতকে নবজাগরণের ফলে ভারতীয়রা পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পায়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সময়, স্বাস্থ্য এবং শ্রমিকের পারিশ্রমিকের যে ধারণা প্রচলিত ছিল তার সম্বন্ধে ভারতীয়রা জানতে পারে। ভারতীয়দের কাছে এর আগে এই বিষয়ে ধারণা অস্পষ্ট ছিল।

মন্তব্য : অধ্যাপক সুশোভন সরকার প্রমুখ ইতালি এবং বাংলার নবজাগরণের মধ্যে মিল ও অমিল উভয়ই খুঁজে পেয়েছেন। আবার ড: অমলেশ ত্রিপাঠী প্রমুখ মনে করেন যে, ইতালির নবজাগরণের সঙ্গে বাংলার নবজাগরণের তুলনা অর্থহীন। বঙ্গীয় নবজাগরণের মূলে প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির গভীরতা থাকলেও ব্রিটিশ রাজত্বে তার প্রাণশক্তি ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। তবুও এই নবজাগরণ বাংলার স্তব্ধ হয়ে যাওয়া জীবনে এক নতুন গতি সঞ্চার করেছিল তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। 


৩) চিনের ৪ঠা মে আন্দোলনের কারণ বিশ্লেষণ করো। এই আন্দোলনের প্রভাব বিশ্লেষণ করো।    ৫+৩


চিনে ৪ঠা মে আন্দোলনের কারণসমূহ :  ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ চিনা জনগণ ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা মেয এক বৌদ্ধিক আন্দোলনের সূচনা করে। এর কারণগুলি হল-

রাষ্ট্রপতি ইউয়েন–সি–কাই এর নির্মমতা :  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইউয়েন – সি – কাই চিনের রাষ্ট্রপতি হয়ে সম্পূর্ণ একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং চীনে বিদেশিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতে থাকেন। সমস্ত সাংবিধানিক পদ্ধতি বাতিল করে তিনি আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলির কাছ থেকে অপমানজনক শর্তে ঋণ নেওয়ার জন্য কথাবার্তা শুরু করেন। তিনি চিনের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রের অপমানজনক বিভিন্ন সন্ধি স্থাপন করলে চিনা জনসাধারণ তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। একে একে বিরোধীদের হত্যা করেন ফলে বিপ্লবের শত্রুতে পরিণত হন তিনি।

কুয়োমিনতাং দল নিষিদ্ধ :  সান-ইয়াৎ-সেন যে উদ্দেশ্যে নিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়েছিলেন তা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ইউনিয়নের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। কিন্তু কয়েক মাস যুদ্ধ চলার পর ইউয়ানের বাহিনী বিপ্লবীদের দমন করতে সক্ষম হয়। ইউয়ান যুদ্ধে জয়লাভের পর কুওমিনতাঙ দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এর ফলে চীনা জনগণের মনে হতাশার সৃষ্টি হয়।

একুশ দফা দাবির প্রতিবাদ :  ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হলে মিত্রশক্তিভুক্ত জাপান চীনের শান্টুঙ প্রদেশ থেকে জার্মান বাহিনীকে বিতাড়িত করে সেখানে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে জাপান চীনের ওপর ২১টি অন্যায় দাবি (১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে) পেশ করে। চীনের পক্ষে এই দাবি মেনে নেওয়া অসম্ভব। ২১ দফা দাবির বিরোধিতায় চিনে বিভিন্ন সমিতি (যেমন নাগরিক দেশপ্রেমী সমিতি) গড়ে ওঠে। বিভিন্ন সংবাদপত্রগুলি নিয়মিতভাবে জাপানি আগ্রসনের কথা ছাপতে থাকে। 

জাপানের সঙ্গে গোপন চুক্তি :  ইউয়েন–সি–কাই চীনের সম্রাট হওয়ার উদ্দেশ্যে জাপানের সঙ্গে এক গোপন চুক্তি করেন এবং জাপানের দাবিগুলো মেনে নেন। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি তিনি সম্রাট পদে অভিষিক্ত হয়ে বিদেশী পণ্য বয়কট আন্দোলন তুলে নিলে চীনা জনগণের মধ্যে অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হয়।

বৈদেশিক পণ্যের বাজার :  প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় চিনে বিদেশী পণ্যের প্রবেশ যথেষ্ট পরিমাণে কমে যায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর চীনের অভ্যন্তরে আবার জাপানসহ অন্যান্য পুঁজিপতি দেশগুলি বাজার দখলের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় চিনে বৈদেশিক বাণিজ্যের অপ্রতুলতার কারণে জাতীয় শিল্পের প্রসার ঘটলেও যুদ্ধশেষে চীনে প্রচুর পরিমাণে বিদেশী পণ্যের আমদানি হতে থাকে। এর ফলে চীনে নবপ্রতিষ্ঠিত দেশজ শিল্পগুলি এই অসম প্রতিযোগিতায় মুখ থুবড়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষ কারণ :  বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চীনে আন্দোলনের পটভূমি তৈরি হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে চিন মিত্রপক্ষে যোগদান করে। চীনের আশা ছিল যে, মিত্রপক্ষ যুদ্ধে জয়লাভ করলে বিদেশিদের কাছ থেকে চিন তার রাজ্যের অংশগুলি ফেরত পাবে এবং বিদেশিদের সঙ্গে অসম চুক্তিগুলি বাতিল হবে। বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসে শান্তি সম্মেলন শুরু হলে সেখানে চীনের প্রতিনিধিগণ 'জাপানের ২১ দফা দাবি' সহ সব অসম চুক্তি এবং জাপানি কর্তৃত্ব বাতিলের দাবি জানান কিন্তু ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ চীনের আবেদনে কর্ণপাত করেননি। কারণ তাদের মতে, চীনের দাবি ছিল আলোচনা বহির্ভূত বিষয়। এই অবস্থায় চীনের প্রতিনিধিরা শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসেন।       

        উপরিউক্ত কারণগুলর সমন্বয়ে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক চেন-তু-শিউ এর ডাকে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ মে আন্দোলনের সূচনা হয়।

বুদ্ধিজীবী-ছাত্রদের ভূমিকা :  চিনা বুদ্ধিজীবী ও ছাত্ররা বিদেশি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হন । তাঁরা চিনে ৪ মে'র আন্দোলনের প্রেক্ষাপট রচনা করেন। 

ইউথ পত্রিকার ভূমিকা :  ১৯১৫ খ্রি: চেন-তু-শিউ ‘ইউথ ম্যাগাজিন' প্ৰকাশ করেন। এই পত্রিকার মাধ্যমে জরাজীর্ণ ঐতিহ্যমণ্ডিত চিন্তাভাবনা দূর করে নতুন প্রগতিশীল বাস্তববাদী ও সংস্কারমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানানো হয় ।

মে আন্দোলনের গুরুত্ব বা প্রভাব : 

ক) দেশাত্মবোধের উদ্ভব :  ৪ মে'র আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই চীনে আধুনিকতা, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রসার ঘটে। প্রথম পর্বে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা ছিল এই আন্দোলনের চালিকাশক্তি। লি-তা-চাও এই আন্দোলনকে মানব মুক্তির সংগ্রাম বলে অভিহিত করেছেন।

খ) আধুনিকতার উদ্ভব :  ৪ মে'র আন্দোলন চিনের প্রাচীন ভাবধারার অবসান ঘটিয়ে পাশ্চাত্যের আধুনিক ভাবধারার জন্ম দিয়েছিল যা চিনকে দ্রুত আধুনিকীকরণের পথে অগ্রসর করেছিল। এইভাবেই চিন নবজাগরণের দিকেও অগ্রসর হয়েছিল । 

গ) সরকারের নতি স্বীকার : ৪ মে'র ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কাছে চিন সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় । 

ঘ) কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা : ৪ মে-র আন্দোলনের ফলে চীনে কুইমিন-তাং দলের পুনর্গঠন হয় এবং কমিউনিস্ট পার্টির উত্থান ঘটে। এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন নেতা ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে চীনে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীকালে এই পার্টি চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। 

ঙ) নারীদের অবস্থার উন্নতি :  এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে চীনের নারীদের অবস্থার উন্নতি হয়। নারী স্বাধীনতা, নারীশিক্ষার বিস্তার ঘটানো, নারী সচেতনতা বৃদ্ধি প্রভৃতি ৪ মে আন্দোলনের মূল কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল।

চ) আন্দোলনের সাফল্য :  সমাজের সকল স্তরের মানুষের অংশগ্রহণের ফলে এই আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং চীন সরকার বিক্ষোভকারীদের সামনে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। বিক্ষোভকারীদের অনেককে মুক্তি দেওয়া হয়, সর্বোপরি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জুন ঘোষণা করা হয় যে, ভার্সাই সন্ধিতে চিনকে স্বাক্ষর করতে হবে না। 


৪) ব্রিটিশ শাসনকালে আদিবাসী সম্প্রদায় ও দলিত সম্প্রদায়ের বিবরণ দাও।   ৮ 


আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিবরণ :  

    ভারতের বিভিন্ন পার্বত্য বনভূমি অঞ্চলে বসবাসকারী সাঁওতাল, ভীল, মুন্ডা, ওঁরাও প্রভৃতি আদিবাসী সম্প্রদায়ের দরিদ্র মানুষেরা চাষবাস, শিকার, কাঠ-মধু-ফলমূল সংগ্রহ করে স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনে নতুন আইন ও বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে তাদের অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। 

ক) ব্রিটিশ করব্যবস্থা :  উনিশ শতকে ভারতের আদিবাসী সম্প্রদায় ব্রিটিশ আইন শাসন ও বিচার ব্যবস্থার আওতায় আসে। সরকার ভূমি বন্দোবস্ত নীতি প্রণয়ন করে আদিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর জমির কর আরোপ করে। ব্রিটিশ সরকার আদিবাসীদের অঞ্চলগুলিতে বিভিন্ন ভূমি বন্দোবস্ত প্রবর্তন করায় যেসব নতুন কর আরোপিত হয় তা দিতে মধ্যস্বত্বভোগীরা তাদের ওপর চাপ দিতে থাকে। 

খ) দিকুদের শোষণ :  বহিরাগত দিকু (মহাজন, জোতদার, বণিক, মহাজন, ঠিকাদার, দালাল প্রভৃতি) -রা সরকার নির্দেশিত রাজস্বের থেকেও বেশি অর্থ আদায়ের জন্য অবর্ণনীয় অত্যাচার চালাত। এই বহিরাগতরা আদিবাসীদের নানাভাবে প্রতারণা ও শোষণ শুরু করে। 

গ) ঝুমচাষ নিষিদ্ধকরণ :  আদিবাসীরা পাহাড় ও মালভূমির বনাঞ্চলে ঝুম চাষ করত। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে আইন পাস করে ব্রিটিশ সরকার অরণ্যকে সংরক্ষিত অঞ্চলে পরিণত করে এবং ঝুমচাষ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি অরণ্যের  উপর একচেটিয়া অধিকার স্থাপন করে। ফলে আদিবাসীদের পশুশিকার, গোচারণ, কাঠ সংগ্রহের মত স্বাভাবিক জীবিকাগুলির উপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়। 

ঘ) সংস্কৃতিতে আঘাত :  আদিবাসী অঞ্চলে মিশনারীদের খ্রিস্টধর্মের প্রচার ও নানা বিধিনিষেধ আরোপিত হওয়ার ফলে আদিবাসীদের চিরাচরিত সংস্কৃতিতে আঘাত লাগে।

ঙ) অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার :  ব্রিটিশ শাসনে আদিবাসীরা জমিতে যৌথ মালিকানার অধিকার হারায়। ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপে আদিবাসীরা জমির উপর যৌথ অধিকার থেকে বিচ্যুত হয় এবং চা-কফির চাষ, রেলপথ নির্মাণ ইত্যাদি কাজে যুক্ত হয়ে বনভূমি থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এবং সীমাহীন অত্যাচারের শিকার হয়ে বহু শ্রমিকের মৃত্যু হয়। সারা দেশে রেলপথ স্থাপনের কাজ শুরু হলে প্রচুর আদিবাসী শ্রমিককে এই কাজে নিয়োগ করা হয়। কয়লা উৎপাদনের কাজেও প্রচুরসংখ্যক আদিবাসী শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। কিন্তু ন্যায্য পারিশ্রমিক না দিয়ে নানাভাবে তাদের বঞ্চিত করা হত।

চ) সামাজিক আগ্রাসন : ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের আদিবাসী সম্প্রদায় বিভিন্ন সামাজিক আগ্রাসনের শিকার হয় খ্রিস্টান মিশনারীরা আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি তাদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করতে থাকে। নতুন পাশ্চাত্য খ্রিস্টান সাংস্কৃতির প্রভাবে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতি আক্রান্ত হয়।

আদিবাসীদের প্রতিরোধ :  ব্রিটিশ সরকার, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও অন্যান্য শোষকশ্রেণীর হাত থেকে মুক্তির জন্য আদিবাসী সম্প্রদায় প্রয়াস চালায়। শুদ্ধি আন্দোলনের যোগদানের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের সামাজিক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এই আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনা ও শোষণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে আদিবাসীরা দিকুদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, যেমন- ভিল বিদ্রোহ, কোল বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ ইত্যাদি। 

দলিত সম্প্রদায়ের বিবরণ :  

    ভারতে অস্পৃশ্য নামে পরিচিত নিম্নবর্ণের মানুষরাই ১৯৩০ এর দশক থেকে নিজেদের দলিত বলে পরিচয় দেয়। মিহির,কুনবি, মাল, নমঃশূদ্র প্রভৃতি এই দলিত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

ক) অস্পৃশ্য রূপে পরিচিত :  সমাজে অস্পৃশ্য রূপে পরিচিত এই শ্রেণী সর্বসাধারণের ব্যবহার্য পুকুর, নদীর ঘাট, কুয়ো ব্যবহার থেকে বঞ্চিত ছিল। মন্দির বা উচ্চবর্ণের ব্যক্তিদের কোন সভা, সমিতি এবং পূজা-পার্বণেও তারা প্রবেশ করতে পারত না। 

খ) শিক্ষার অভাব :  ব্রাহ্মণরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃত ভাষা এবং ইংরেজি ভাষা শিক্ষা লাভ করে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনুরাগী হয়ে উঠেছিল। দলিত শ্রেণীর মানুষ ইংরেজি বা সংষ্কৃত ভাষা জানতো না। তারা নিজেদের কথ্য ভাষা ব্যবহার করত। কিন্তু ব্রাহ্মণরা দলিত শ্রেণীর এই কথাকে খুবই অবজ্ঞার চোখে দেখত। সমাজে দলিতদের শিক্ষার কোন অধিকার ছিল না। পাশ্চাত্য শিক্ষা বা সরকারি কোনো কর্মস্থলে চাকুরী লাভের অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত ছিল। 

গ) দারিদ্রতা :  দলিত শ্রেণীর লোকেরা মাছ ধরা, মাদক দ্রব্য তৈরি, দড়ি তৈরি, পথঘাট সংস্কার, জঞ্জাল সাফাই প্রভৃতি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। ফলে এদের অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। 

ঘ) রাজনীতিতে উপেক্ষিত :   কংগ্রেস গঠনের প্রথম দিকে উচ্চবর্ণের প্রাধান্য থাকায় কংগ্রেস নেতারা দলের সমস্যা সম্পর্কে উদাসীন ছিল ফলে তাদের সঙ্গে দলিতদের দূরত্ব বাড়তে থাকে কংগ্রেসের বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্রিয় হয়ে ওঠে গান্ধীজী অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে দলের প্রতি সামাজিক অবহেলার বিষয়টিকে কংগ্রেসের কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করেন কিন্তু গান্ধীজীর সাবধানে উদ্যোগ সন্তুষ্ট করতে পারেনি। 

ঙ) বাংলায় দলিতদের সক্রিয়তা :  বাংলায় দলিত নমঃশূদ্র সম্প্রদায় ব্রাহ্মণ শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সরব হয়। মতুয়া ধর্মের প্রবর্তক হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নমঃশূদ্র সম্প্রদায় উনিশ শতকের শেষে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের আর্থিক শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। পূর্ববঙ্গে উচ্চবর্ণের মধ্যে কংগ্রেসের ভিত্তি সুদৃঢ় হলে নমঃশূদ্রদের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন প্রমথরঞ্জন ঠাকুর, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রমুখ নেতা। প্রকৃতপক্ষে নমঃশূদ্রদের এই উদ্যোগের মধ্যে সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদের ভাষায় লুকিয়ে ছিল।

চ) পুনা চুক্তি :  ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ড তাঁর 'সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা' (১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ) নীতির মাধ্যমে দলিতদের পৃথক নির্বাচনের অধিকার দিলে গান্ধীজি এর তীব্র প্রতিবাদ করে অনশন শুরু করেন (২০ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ)। শেষ পর্যন্ত পুনা চুক্তির (২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ) মাধ্যমে আম্বেদকর দলিতদের পৃথক নির্বাচনের অধিকারের দাবি থেকে সরে আসেন এবং গান্ধীজিও দলিতদের আরও বেশি সংখ্যক আসন সংরক্ষণের দাবি মেনে নেন।

ছ) আম্বেদকরের ভূমিকা :  গান্ধীজী-সহ অন্যান্য কিছু নেতার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা অস্পৃশ্যতা-বিরোধী দলিত নেতা আম্বেদকরের কাছে বিশেষ মূল্যবান ছিল না। দলিতদের মন্দিরে প্রবেশ বা উচ্চবর্ণের সঙ্গে মেলামেশার অধিকারের চেয়ে তিনি দলিতদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটানোর বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে দলিতদের নিয়ে মহারাষ্ট্রে সত্যাগ্রহ আন্দোলন করেন এবং প্রকাশ্যে 'মনুস্মৃতি' গ্রন্থটি পুড়িয়ে তিনি ব্রাহ্মণ ধর্মের বিরোধিতা করেন।

দলিতদের আন্দোলন :  সামাজিক বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে জাস্টিস পার্টির মতো সংগঠন গড়ে তুলে তারা নিজেদের আন্দোলন চালাতে থাকে। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে সর্বভারতীয় নিপীড়িত শ্রেণীর কংগ্রেস গঠিত হলে দলিত আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। আম্বেদকর ও গান্ধীজীর মধ্যে স্বাক্ষরিত পুনা চুক্তি (১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ) হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার লাভ করে দলিতরা। স্বাধীনতার পর ভারতীয় সংবিধান কার্যকরী হলে অস্পৃশ্যতাকে বেআইনি বলে ঘোষণা করা হয়। 


৫) মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো। এই আইনের ত্রুটিগুলি আলোচনা করো।  ৪+৪ 

উত্তর- 

মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারের বৈশিষ্ট্যসমূহ : 

১) কেন্দ্রীয় আইনসভার গঠন ও তার সদস্য সংখ্যা : ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইনের দ্বারা কেন্দ্রীয় আইনসভা গঠন করা হয় এর বিশেষ দিক গুলি ছিল- (ক) আইন প্রণয়ন: কেন্দ্রীয় আইনসভা সারা ভারতের জন্য আইন প্রণয়ন করার অধিকার ছিল। (খ) বড়লাটের আইন বিষয়ক ক্ষমতা: আইন সভার সদস্যরা সভায় কোন বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন, বিতর্কে যোগদান, ছাঁটাই বা সংশোধনী প্রস্তাব পেশ প্রভৃতির অধিকার পেলেও বৈদেশিক নীতি, সামরিক বিভাগ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বড়লাটের আগাম অনুমতি ছাড়া তারা এসব বিষয়ে আলোচনার অধিকার পেত না। বড়লাট আইনসভার যে কোন আইন সংশোধন বা বাতিল করতে পারতেন। তিনি নিজেও 'অর্ডিন্যান্স' জারি করে আইন প্রণয়ন করতে পারতেন। (গ) দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা: কেন্দ্রের দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা গঠন করা হয়। এর নিম্নকক্ষের নাম কেন্দ্রীয় আইনসভা ও উচ্চকক্ষের নাম রাষ্ট্রীয় পরিষদ। (ঘ) উচ্চকক্ষের ও নিম্নকক্ষের সদস্যসংখ্যা: উচ্চকক্ষে ৬০ জন সদস্য রাখা হয়, যার মধ্যে ২৬ জন ছিলেন বড়লাটের দ্বারা মনোনীত এবং ৩৪ জন ছিলেন নির্বাচিত সদস্য। নিম্নকক্ষে ১৪০ জন (পরে ১৪৫ জন) সদস্য রাখার ব্যবস্থা করা হয়, এদের মধ্যে ৪০ জন ছিলেন মনোনীত এবং ১০০ জন (পরে ১০৫ জন) ছিলেন নির্বাচিত। 

২) প্রদেশের শাসনব্যবস্থা : প্রদেশের দায়িত্বকে সংরক্ষিত ও হস্তান্তরিত - এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। সাধারণ প্রশাসন, পুলিশ, অর্থ, বিচার এগুলি সংরক্ষিত এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বায়ত্তশাসন প্রভৃতি হস্তান্তরিত ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া পৌরসভা, ইউনিয়ন বোর্ড গড়ে তুলে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থাও চালু করা হয়। 

৩) ভারত সচিবের কাউন্সিল : ভারত সচিবের কাউন্সিলের সদস্য সংখ্যা ৮ থেকে 12 -র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং তাদের কার্যকালের মেয়াদ ছিল ৫ বছর। এতদিন পর্যন্ত সদস্যদের বেতনের ব্যয়ভার ভারতীয় রাজস্ব থেকে মেটানো হত কিন্তু এই নতুন আইনে স্থির হয় এই বেতনভার বহন করবে ব্রিটিশ সরকার - যা ছিল মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। 

৪) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠন : ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইনের দ্বারা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ বা বড়লাটের শাসন পরিষদ গঠন করা হয়। এর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হল- এই পরিষদ ৭ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয়, এর মধ্যে অন্তত ৩ জন সদস্য ছিলেন ভারতীয়। বড়লাট তাঁর অধীনস্ত শাসন পরিষদের সহায়তায় নিজ দায়িত্বে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তিনি তাঁর কার্যাবলীর জন্য সরাসরি ভারত-সচিব ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কাছে দায়ী থাকতেন, ভারতীয় আইনসভার কাছে নয়। 

মন্টেগু-চেমসফোর্ড আইনের ত্রুটিসমূহ : 

১) সরকারি নিয়ন্ত্রণ : ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে বড়লাট প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী হন। ভারতীয় আইনসভার ক্ষমতা হ্রাস করে ভারত শাসন বিষয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়। প্রদেশগুলোতে ছোটলাট অনুরূপ ক্ষমতা লাভ করেন। কেন্দ্র ও প্রদেশে সরকার পক্ষেরই সংখ্যাধিক্য বজায় থাকতো। এই আইনের দ্বারা কেন্দ্রীয় গভর্নর জেনারেল এবং প্রদেশ গভর্নরের চূড়ান্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে কেন্দ্র ও প্রদেশের নির্বাচিত আইনসভা কার্যত ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে।

২) দ্বৈত শাসনব্যবস্থার ত্রুটি : এই আইনে প্রদেশে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। কেন না, প্রদেশে গভর্নর ছিলেন চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। তিনি তাঁর মন্ত্রিসভার যে কোন সিদ্ধান্ত নাকোচ করতে পারতেন। প্রাদেশিক শাসন কার্য সংরক্ষিত ও হস্তান্তরিত - এই দুটি ভাগে ভাগ করে একদিকে ক্ষমতাহীন দায়িত্ব এবং অন্যদিকে দায়িত্বহীন ক্ষমতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, এর ফলে শাসন কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।

৩) সীমিত ভোটাধিকার ও পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা : ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন দ্বারা কেবলমাত্র মুষ্টিমেয় ভারতীয়রাই ভোটাধিকার লাভ করেছিল। এই আইনের দ্বারা স্বল্পসংখ্যক ধনী ব্যক্তি (ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০%) ভোটাধিকার পান। সর্বসাধারণের ভোটদানের অধিকার স্বীকৃত হয়নি। আবার মর্লে-মিন্টো আইনে যে সাম্প্রদায়িক নির্বাচন পদ্ধতি গৃহীত হয়েছিল ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইনেও তা বজায় থাকে। এর ফলে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ঐক্য ক্ষুন্ন হয়, তাই বলা যায় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের আইন ভারতবাসীর আশা পূরণে ব্যর্থ হয়। 

৪) সীমিত অর্থ বরাদ্দ : ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের আইনে জনকল্যাণ মূলক কাজের জন্য খুবই সীমিত অর্থ ধার্য করা হয়েছিল সীমিত অর্থে জনকল্যাণের মত বিশাল কর্ম পরিচালনা করা কখনোই সম্ভব ছিল না। 

৫) সাম্প্রদায়িকতা : এই আইনের দ্বারা ভারতের সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ আরও বৃদ্ধি পায়। মুসলিমদের পৃথক ভোটাধিকার দান করা হলে সাম্প্রদায়িক বিভেদ বৃদ্ধি পায়। এসব কারণেই এই আইন ভারতীয়দের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। এজন্য জাতীয় কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশনে এই আইনকে "তুচ্ছ, বিরক্তিকর ও নৈরাশ্যজনক" বলে সমালোচনা করা হয়। শ্রীমতি অ্যানি বেসান্ত একে "দাসত্বের পরিকল্পনা" বলে অভিহিত করেন। 

৬) দায়িত্বশীলতার অভাব :  এই আইন অনুসারে বড়লাট তার কাজের জন্য ভারতীয় আইনসভার কাছে দায়ী ছিলেন না। তিনি দায়ী ছিলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও ভারত সচিবের কাছে। ফলে এই আইনের দ্বারা ভারতের কোন দায়িত্বশীল শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।


৬) জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পটভূমি আলোচনা করো। এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কীরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল? এই ঘটনার গুরুত্ব আলোচনা করো। ৩+২+৩ 


জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পটভূমি : 

     ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তীব্র দমনমূলক রাওলাট আইন পাস করলে এই আইনের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে প্রতিবাদ আন্দোলন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পাঞ্জাবে রাওলাট বিরোধী আন্দোলনের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ও মর্মান্তিক ঘটনা ছিল ১৩ই এপ্রিল ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের জালিয়ানওয়ালাবাগের মাঠে একটি শান্তিপূর্ণ জমায়েতে ইংরেজ পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং এর ফলে অন্তত ১০০০ মানুষের মৃত্যু। এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পটভূমি নিম্নে আলোচনা করা হলো--

১) পাঞ্জাবে নির্যাতন :  জুলুম চালিয়ে যুদ্ধের জন্য পাঞ্জাব থেকে সেনা ও অর্থ সংগ্রহ, 'গদর বিদ্রোহ' প্রতিরোধ প্রভৃতি উদ্দেশ্যে সরকার পাঞ্জাবের তীব্র দমন চালালে পাঞ্জাব ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পাঞ্জাবের কর্মচ্যুত সেনাদের সমাবেশে এই ক্ষোভ তীব্র হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় পাঞ্জাবের গভর্নর মাইকেল ও' ডায়ারের অত্যাচারী শাসন পাঞ্জাবকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করে।

২) রাওলাট আইন : ভারতীয়দের স্বাধীনতা ও অধিকার হরণ এবং আন্দোলন কঠোর হাতে দমনের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী রাওলাট আইন প্রবর্তন করে। এই নিষ্ঠুর দমনমূলক আইনের বিরুদ্ধে দেশের সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদের সরব হয়ে ওঠে। এই আইনের প্রতিবাদে পাঞ্জাব বারুদের স্তুপে পরিণত হয়।

৩) নেত্বৃবৃন্দের গ্রেফতার :  'পিপলস কমিটি' নামে একটি গণসংগঠন লাহোর ও অমৃতসরে রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে ব্যাপক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন ও হিংসাত্মক কর্মকান্ডে মদত দেওয়ার অভিযোগে সরকার অমৃতসরের দুই নেতা ডঃ সাইফুদ্দিন কিচলু এবং ডঃ সত্যপালকে গ্রেফতার করে। ফলে পাঞ্জাবের সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এদিকে গান্ধীজিকে গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়লে লাহোরে ব্যাপক ধর্মঘট শুরু হয়। পাঞ্জাবের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে জনতার খন্ড যুদ্ধ বেধে যায়। 

৪) অমৃতসরে সামরিক শাসন :  রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ক্রমশ জোরদার হয়ে উঠলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইকেল ও' ডায়ারের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর হাতে অমৃতসর শহরের শাসনভার তুলে দেওয়া হয়। এই বাহিনী অমৃতসরে সামরিক আইন জারি করে ১১ই এপ্রিল শহরে জনসভা ও সমাবেশ নিষিদ্ধ করে।

হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রতিক্রিয়া :   

      জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভারতবাসীর কাছে ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত নগ্নরূপটি প্রকাশ্যে বেরিয়ে পড়ে। সরকার জালিয়ানওয়ালাবাগের সভায় গুলি চালানোর ঘটনাকে সমর্থন করে। ভারত সচিব মন্টেগু এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে 'নিবারণমূলক হত্যাকাণ্ড' বলে অভিহিত করেন। ভারতীয়রা এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। যেমন–

১) ক্ষোভ-বিক্ষোভ :  জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রতিবাদে সারা ভারত ক্ষোভ ক্রোধ ও ঘৃণায় ফেটে পড়ে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন যে, "এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ভারতে যে মহাযুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেয় তা উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ে সবার হৃদয়কে আন্দোলিত করে।" 

২) উপাধি ত্যাগ :  জালিয়ানওয়ালাবাগের পৈশাচিক ও ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া 'নাইট' উপাধি ত্যাগ করেন। গান্ধীজি ও ব্রিটিশদের দেওয়া 'কাইজার-ই-হিন্দ' উপাধি ত্যাগ করেন। একসময় ব্রিটিশ শাসনকে 'ঈশ্বরের আশীর্বাদ' বলে মনে করা গান্ধীজি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদস্বরূপ 'ইয়ং ইন্ডিয়া' পত্রিকায় লেখেন যে, "এই শয়তান সরকারের সংশোধন অসম্ভব, একে অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে।" 

৩) কংগ্রেসের প্রতিবাদ :  জাতীয় কংগ্রেস জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে। কংগ্রেস নেতা সি.এফ. এন্ডুজ এই ঘটনাকে 'কসাইখানার গণহত্যার' সমতুল্য বলে নিন্দা করেছেন। ব্রিটিশ সরকারের উপর আস্থা হারিয়ে কংগ্রেস নিজের উদ্যোগে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং হত্যাকান্ডের জন্য ডায়ারকে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে শাস্তি দানের সুপারিশ করে।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের গুরুত্ব : ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে জালিয়ান ওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের মতো নৃশংস ঘটনার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। 

১) ব্রিটিশ সরকারের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন : এই হত্যাকাণ্ড ভারতে ব্রিটিশ শাসনের পশুসুলভ চরিত্রটি সমগ্র ভারতবাসীর কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছিল।

২) ব্রিটিশবিরোধীর নতুন অধ্যায় : ব্রিটিশ সরকারের ন্যায় বিচার এবং সুষ্ঠু প্রশাসন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের মধ্যে যে ধারণা এবং আনুগত্য গড়ে তুলেছিল তা ভেঙে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘৃণাভরে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া 'নাইট' উপাধি ত্যাগ করেন। গান্ধীজী লিখেন, "এই শয়তান সরকারের সংশোধন অসম্ভব, একে ধ্বংস করতেই হবে।" এরপর ভারতীয় রাজনীতিতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

৩) ভীতি প্রদর্শন : জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ভারতীয় রাজনীতিবিদদের মনে গভীর ভয় ভীতির সৃষ্টি করে। পাঞ্জাব থেকে বহুদূরে কলকাতা শহরে একটি প্রতিবাদ সভা করার সাহসও তাদের ছিল না। এর ফলে ভারতব্যাপী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের গতি কিছুটা মন্থর হয়ে পড়ে।

৪) ব্রিটিশ সরকারের বোধোদয় : জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার কথা প্রকাশিত হলে ইংল্যান্ডের নানান প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রসচিব চার্চিল এই ঘটনাকে 'দানবীয়' বলে অভিহিত করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। 

৫) রাওলাট সত্যাগ্রহ প্রত্যাহার : রাওলাট আইনের প্রতিবাদে গান্ধীজী সত্যাগ্রহের কর্মসূচি নিয়েছিলেন তাতে হিংসার প্রবেশ হয়েছে দেখে তিনি মর্মাহত হন। এই কারণে রাওলাট সত্যাগ্রহের কর্মসূচিকে তিনি "হিমালয় সদৃশ প্রমাদ" বলে অভিহিত করেন এবং ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন।

৬) অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নির্মাণ : এই নারকীয় ঘটনার কিছুদিনের মধ্যে গান্ধীজীর নেতৃত্বে 'অসহযোগ আন্দোলন' নামে এক বৃহত্তর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল যে আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল এই নৃশংস ঘটনার অন্যায়ের সুবিচার করা।


৭) ইন্দোনেশিয়ায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠার কারণ কী ছিল? এই আন্দোলনে ড: সুকর্ণ এর ভূমিকা আলোচনা করো।  ৪+৪ 

      ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠার কারণসমূহ: উনবিংশ শতকের শেষভাগে ডাচ উপনিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ইন্দোনেশিয়ায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে সুকর্ণের নেতৃত্বে ইন্দোনেশীয় জাতীয়তাবাদী দল এবং কমিউনিস্টরা যৌথভাবে ওলন্দাজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠার কারণগুলি হল- 

১) ওলন্দাজদের শোষণ : ওলন্দাজ কোম্পানির শাসনের অবসানের পর ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ওলন্দাজ সরকার প্রত্যক্ষভাবে ইন্দোনেশিয়ার শাসনভার হাতে নেয়। বেশি অর্থ উপার্জনের জন্য ওলন্দাজরা কৃষকদের বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদন করতে বাধ্য করে ও উচ্চ হারে কর আরোপ করে। ফলে কৃষকরা দারিদ্র্য ও দুর্ভাগ্যের শিকার হয়। একারণে বিংশ শতকের শুরুতে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকে।

২) জাপানের অগ্রগতি : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হলান্ড জার্মানির দখলে চলে যায়। এসময় ইংল্যান্ডের উপনিবেশ ইন্দোনেশিয়ায় শক্তি শূন্যতার সৃষ্টি হলে জাপান সেই সুযোগ গ্রহণ করে এবং এশীয় অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদী নীতির সূচনা ঘটায়। এশীয় ভূখন্ডে জাপানের কাছে ইউরোপীয় শক্তিগুলির পরাজয় ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার অন্যান্য উপনিবেশগুলির বাসিন্দাদের উৎসাহিত করেন। তারা উপলব্ধি করে যে, এশিয়ার পক্ষে ইউরোপীয় শক্তিকে পরাস্ত করে স্বাধীনতা লাভ করা সম্ভব।

৩) নিষ্ঠুর দমন নীতির প্রয়োগ : ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক কমিউনিস্ট বিদ্রোহ দেখা দিলে সরকার নিষ্ঠুর দমননীতি চালিয়ে এই বিদ্রোহ দমন করে। ড: সুকর্ণকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁর জাতীয়তাবাদী দল ভেঙে দেওয়া হয়। বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী নেতা ডঃ মোহাম্মদ হাত্তা,জাহরির প্রমুখ দেশ থেকে বহিস্কৃত হন। 

৪) জাপানের উদ্যোগ : জাপান এশিয়ার বিভিন্ন উপনিবেশে আধিপত্যের প্রচার ঘটালেও তাদের ওপর ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো নগ্ন শোষণ ও নির্যাতন চালায় নি। বরং জাপান এশিয়ার এইসব দেশে জাতীয়তাবাদের প্রসার ও মুক্তিসংগ্রামের মানসিকতাকে আরও শক্তিশালী হতে সাহায্য করেছিল। জাপান রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তিপ্রদান, দেশীয় ভাষার ব্যবহার চালু করে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতাকে আরও ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করেছিল। 

ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ড: সুকর্ণের ভূমিকা : 

    ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ইন্দোনেশিয়ায় ডক্টর সুকর্ণ নেতৃত্বে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদী দল এবং কমিউনিস্টরা যৌথভাবে ওলন্দাজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করে। 

১) জাতীয়তাবাদের প্রচার : জাপানের সদর্থক ভূমিকার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে ইন্দোনেশিয়ায় জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সুকর্ণ প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী দল ইন্দোনেশিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই সব জাতীয়তাবাদী দলের আন্দোলনের চাপে পড়লে ইন্দোনেশিয়ায় তীব্র অত্যাচার ও নির্যাতন শুরু করে।

২) প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা : ইন্দোনেশিয়ায় জাতীয়তাবাদীরা ওলন্দাজদের ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম শুরু করে এবং হলান্ড এর বিরুদ্ধে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা ঘোষণা করে সেখানে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। জাপানে একে স্বীকৃতি দেয়। 

৩) সুমাত্রা ও জাভা আক্রমণ : হল্যান্ডের সামরিক তৎপরতায় সুমাত্রা ও জাভা ছাড়া অবশিষ্ঠ ইন্দোনেশিয়া ওলন্দাজদের অধীনে চলে যায়। ওলন্দাজরা ইন্দোনেশিয়ায় ঘোষিত প্রজাতান্ত্রিক সরকারের রাষ্ট্রপতি সুকর্ণ ও প্রধানমন্ত্রী হাত্তাকে গ্রেপ্তার করে। প্রতিবাদে ইন্দোনেশিয়া মুক্তিসংগ্রামে তীব্র হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় বৃটেনের মধ্যস্থতায় হলান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু হলান্ড এই চুক্তি অগ্রাহ্য করে হঠাৎ সুমাত্রা ও জাভা আক্রমণ করলে ইন্দোনেশিয়ার সর্বত্র বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। 

৪) আমেরিকার উদ্যোগ : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট ইউরোপীয় উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর স্পষ্ট মতামত জানিয়েছিলেন। ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার প্রতি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স সমর্থন জানায়।

৫) স্বাধীনতা লাভ : প্রবল আন্দোলনের চাপে হলান্ড ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়। সুকর্ণ স্বাধীন ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর পরই বহু জাতি ও ধর্ম অধ্যুষিত ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় ঐক্য সংকটের মুখে পড়ে। ফলে রাষ্ট্রপতি সুকর্ণ ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে সেখানকার সংবিধান বাতিল করে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র প্রবর্তন করতে বাধ্য হন।


৮) শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে রামমোহন রায়ের অবদান লেখো।  ৪+৪

 উত্তর: 

সূচনা:  আধুনিক ভারতে যেসব সংস্কারক জন্মগ্রহণ করেছেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগণ্য ছিলেন রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২ মতান্তরে ১৭৭৪ - ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দ)। রামমোহন ভারতীয় সমাজের অন্ধকার ও কুসংস্কার দূর করে জাতিকে আলোর পথ দেখান। পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু তাঁকে 'ভারতের জাতীয়তাবাদের জনক' বলে অভিহিত করেছেন। বিপিনচন্দ্র পাল তাঁকে 'নবযুগের প্রবর্তক' উপাধিতে ভূষিত করেন। মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ তাঁকে 'রাজা' উপাধি দেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে 'ভারত পথিক' আখ্যায় অভিহিত করেছেন। তিনি যোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আধ্যাত্বিক অন্ধকারের ঘোর কাটিয়ে জনগণকে মুক্তির আলো দেখাতে চেয়েছিলেন। এ জন্য আধুনিক ভারত চেতনায় তাঁকে ইউরোপের জন উইক্লিফের মত  'Morning star of reformation' বলা যেতে পারে।

রাজা রামমোহন রায়ের শিক্ষাসংস্কার : 

    রামমোহন রায় বিশ্বাস করতেন যে, ভারতবাসীকে অন্ধকারময় কুসংস্কারাচ্ছন্ন জীবন থেকে আলোয় ফেরাতে পারে একমাত্র যুক্তি নির্ভর পাশ্চাত্য শিক্ষা। তিনি প্রাচ্যের মহান চিন্তা ধারার সঙ্গে পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণা সমন্বয়ে ঘটাতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁকে সমন্বয়বাদী-ও বলা হয়ে থাকে।

১) পাশ্চাত্য শিক্ষার সমর্থক :  রামমোহন রায় ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের এক উগ্র সমর্থক ছিলেন। তিনি ভারতীয়দের ইংরেজি, পাশ্চাত্যের গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, প্রকৃতিবিদ্যা, শারীরবিদ্যা প্রভৃতি আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের কথা বলেন। তিনি তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্টকে একটি পত্রের মাধ্যমে (১৮২৩ খ্রিস্টাব্দ) এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ঘটাতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অনুরোধ জানান।

২) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন :  রামমোহন স্কটিশ মিশনারি আলেকজান্ডার ডাফকে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে 'জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন' প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। রামমোহন ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় 'অ্যাংলো হিন্দু স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় 'হিন্দু কলেজ' প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করেন বলে অনেকে মনে করেন। তিনি ডেভিড হেয়ারের শিক্ষা বিস্তারের কাজে অন্যতম সহায়ক ছিলেন। বেদান্ত শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি 'বেদান্ত কলেজ' (১৮২৬ খ্রিস্টাব্দ) প্রতিষ্ঠা করেন। 

৩) বাংলা গদ্যে অবদান :  শ্রীরামপুরের মিশনারিগণ বাংলা গদ্যের যে কাঠামো তৈরি করেছিলেন তাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন রামমোহন রায়। তিনি ১৮১৫-৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় ৩০ টি বাংলা গ্রন্থ রচনা করেন। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল 'বেদান্তগ্রন্থ' (১৮১৫ খ্রি.), বেদান্তসার (১৮১৫ খ্রি.), 'ভট্টাচার্যের সহিত বিচার' (১৮১৭ খ্রি.), 'সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক ও নিবর্তকের সংবাদ (১৮১৮ খ্রি.), 'গোস্বামীর সহিত বিচার' (১৮১৮ খ্রি.), 'সহমরণ বিষয়ক প্রবর্তক ও নিবর্তকের দ্বিতীয় সংবাদ (১৮১৯ খ্রি.), 'ব্রাহ্মণসেবধি' (১৮২১ খ্রি.), 'পথ্যপ্রদান' (১৮২৯ খ্রি.) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। 

৪) সংবাদপত্র প্রকাশনা : রামমোহন রায় সংবাদপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তিনি বাংলা, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত 'সংবাদ কৌমুদী' (১৮২১ খ্রিস্টাব্দ) এবং ফারসি ভাষায় প্রকাশিত 'মিরাৎ-উল-আকবর' (১৮২২ খ্রিস্টাব্দ)। 

রামমোহন রায়ের সমাজসংস্কার : 

    ঊনবিংশ শতকে ভারতের ধর্ম ও সমাজকে কুসংস্কারের রাহুগ্রাস থেকে উদ্ধার করে মানবতাবাদী সমাজ সংস্কারক রামমোহন ভারতবাসীকে আলোর পথ দেখান। 'আধুনিক ভারতের জনক' রাজা রামমোহন রায়ের সমাজসংস্কারমূলক কর্মসূচিগুলি হল– 

১) জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা :  রামমোহন হিন্দু সমাজে জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতা প্রথার তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি 'বজ্রসূচী' (১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দ) গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ করে প্রচার করেন যে, জাতিভেদ প্রথা শাস্ত্রসম্মত নয়। তিনি অসবর্ণ বিবাহের সমর্থনে বিভিন্ন পুস্তিকা রচনা করেন। তিনি সমস্ত ধর্মের মানুষের সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছিলেন। 

২) সতীদাহ প্রথা নিবারণ :  তৎকালীন হিন্দু সমাজে উচ্চবর্ণের মধ্যে মৃত স্বামীর চিতায় তার জীবিত স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারা হত, এই অমানবিক প্রথা 'সতীদাহ প্রথা' নামে পরিচিত। এই প্রথার বিরোধিতা করে রামমোহন জনমত গড়ার উদ্দেশ্যে প্রচারকার্য চালান। তিনি বড়লাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিং এর কাছে ৩০০ জন বিশিষ্ট নাগরিকের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি আবেদনপত্র জমা দিয়ে এই প্রথা বন্ধের দাবি জানান। তাঁর আবেদনে সাড়া দিয়ে ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ ডিসেম্বর ১৭ নং রেগুলেশন জারি করে সতীদাহ প্রথাকে বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করেন।

৩) নারীকল্যাণ : রামমোহন অনুভব করেছিলেন নারীদের অবস্থার উন্নতি ও মর্যাদা বৃদ্ধি করতে না পারলে সমাজের অগ্রগতি ঘটবে না। তাই তিনি নারীদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। তিনি বিভিন্ন শাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেন যে, পিতা বা স্বামীর সম্পত্তিতে নারীর অধিকার আছে। তিনি স্ত্রী শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কৌলিন্য প্রথার অভিশাপ থেকে নারী সমাজকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি প্রয়াস চালান। নারীর বিবাহ বিষয়ক আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে তিনি প্রচেষ্টা করেন। 

৪) সংস্কারকামী প্রতিষ্ঠান :  একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী রামমোহন তাঁর বহুবিধ সংস্কারকার্যের জন্য ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে 'ব্রাহ্মসভা' স্থাপন করেন, যা ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে 'ব্রাহ্মসমাজ' নামে পরিচিত লাভ করে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রমুখ গণ্যমান্য ব্যক্তিত্ব এই সংগঠনে যোগদান করেছিলেন; যদিও মতাদর্শের কঠোরতার জন্য এই সমাজ পরবর্তীকালে বিভক্ত হয়ে যায় তথাপি বহুদিন পর্যন্ত এই সমাজের সংস্কারমুখী কার্যকলাপ অব্যাহত ছিল। এঁরা মূলত পৌত্তলিকতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, জাতিভেদ প্রথা এবং সর্বোপরি সতীদাহ প্রথার ন্যায় নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। 

 

  উপসংহার :    রামমোহন রায় মধ্যযুগের তন্দ্রা, জড়তা, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের হাত থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করে নবজাগরণ ঘটাতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন "Morning star of Bengal Renaissance"। ভারতবর্ষে আধুনিক যুগের আবির্ভাব ঘটেছিল তার হাত ধরেই কারণ তিনি প্রথম পাশ্চাত্য শিক্ষা ও যুক্তিবাদের প্রসারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, "Rammohan Roy inaugurated the modern age in India"।