উত্তর: প্রাচীন ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, দার্শনিক তথা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রী ও সমর বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিলেন কৌটিল্য চাণক্য নামে তক্ষশীলার এক ব্রাহ্মণ, যিনি তাঁর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা জন্য ভারত ইতিহাসে মেকিয়াভেলি নামে পরিচিত।
২) অর্থশাস্ত্রের বিষয়বস্তু কী ?
উত্তর: কৌটিল্য রচিত অর্থশাস্ত্র গ্রন্থটি থেকে মধ্যযুগের ভারতের আর্থসামাজিক অবস্থার বাস্তবচিত্রের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রকৃতি, রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা, রাজার দৈনন্দিন কার্যকলাপ, দণ্ডনীতি, আমলাতন্ত্র, যুদ্ধজয়ের উপায়, বিচারব্যবস্থা, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ও গুপ্তচর ব্যবস্থা প্রভৃতি সম্বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারা যায়।
৩) জিয়াউদ্দিন বরনী কে ছিলেন?
উত্তর: জিয়াউদ্দিন বরনী ছিলেন ভারতে তুর্কি যুগের বিখ্যাত ঐতিহাসিক। তিনি গিয়াসউদ্দিন বলবন থেকে আলাউদ্দিন খলজী ও মহম্মদ বিন তুঘলক পর্যন্ত তিন জন সুলতানের সমসাময়িক ছিলেন। তাঁর রচিত দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল 'ফতোয়া-ই-জাহান্দারি' এবং 'তারিখ-ই-ফিরোজশাহী'।
৪) ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল-- প্রথমত, এই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সর্বশক্তিমান ঈশ্বর একক সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। দ্বিতীয়ত, এখানে ঈশ্বরের আদেশ বা নির্দেশ আইন হিসেবে প্রযুক্ত হয়। তৃতীয়ত, ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে পুরোহিত বা শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
৫) ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সাধারণভাবে যে রাষ্ট্রে ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে গভীর সম্পর্ক বর্তমান থাকে তথা পুরোহিত বা যাজক বা উলেমাদের দ্বারা রাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয়, তাকে ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র বলে। উল্লেখ্য, ধর্মাশ্রয়ী শাসনব্যবস্থার ইংরেজি প্রতিশব্দ 'থিওক্রেসি' কথাটি গ্রিক শব্দ 'থিওস' থেকে এসেছে যার অর্থ 'দেবতা'। কয়েকটি ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্র হল আফগানিস্তান, ইরান, সৌদি আরব প্রভৃতি।
৬) উলেমা কারা?
উত্তর: ইসলাম ধর্ম ও শরিয়তী আইনের ব্যাখ্যাকার মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদদের উলেমা বলা হয়। এরা সুলতানি আমলে বিচার ও প্রশাসনের উচ্চপদে নিযুক্ত হতেন।
৭) সিসেরো কে ছিলেন?
উত্তর: রোমের প্রখ্যাত মনীষী মার্কাস তুলিয়াস সিসেরো একাধারে ছিলেন দার্শনিক, সাহিত্য রচয়িতা, আইনজ্ঞ, বাগ্মী, কনসাল ও সর্বোপরি সংবিধান বিশেষজ্ঞ। এছাড়া রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তথা প্রখ্যাত প্রজাতান্ত্রিক চিন্তাবিদ হিসেবেও তিনি ছিলেন সুপরিচিত।
৮) সিসেরোর দুটি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম লেখো।
উত্তর: সিসেরোর দুটি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম হল-- i) De Republica ii) De Lagibus (On the Laws)। এগুলি ল্যাটিন ভাষায় রচিত।
৯) সপ্তম হেনরি কে ছিলেন?
উত্তর: সপ্তম হেনরি ছিলেন ইংল্যান্ডের টিউডর বংশের প্রতিষ্ঠাতা। সিংহাসন আরোহণের পরপরই তিনি ইংল্যান্ডের শাসন ব্যবস্থা তথা রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন যা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
১০) নব্য রাজতন্ত্র বলতে কী বোঝো?
উত্তর: ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে টিউটর বংশীয় সপ্তম হেনরির ইংল্যান্ডে সিংহাসন আরোহনের মাধ্যমে পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি,, আভিজাত্য ও সামন্ত প্রভুদের ক্ষমতা হ্রাস, বিচার বিভাগের মর্যাদা বৃদ্ধি ও যুক্তিবাদী জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা-সহ শাসনতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহীত হয়। সপ্তম হেনরি প্রতিষ্ঠিত এই রাজতন্ত্রকে 'নব্য রাজতন্ত্র, নামে অভিহিত করা হয়।
১১) টিউডর বিপ্লব কী?
উত্তর: দ্বিতীয় টিউডর শাসক অষ্টম হেনরির প্রধান উপদেষ্টা টমাস ক্রমওয়েলের নেতৃত্বে পোপের পরিবর্তে রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি, জাতীয় চার্চ গঠন তথা জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা-সহ ইংল্যান্ডের সরকার ও প্রশাসনের একাধিক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সংঘটিত হয়। এটি আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর প্রশস্ত করে বলে এই ঘটনা টিউডর বিপ্লব নামে অভিহিত হয়।
১২) টমাস ক্রমওয়েল কে ছিলেন?
উত্তর: টমাস ক্রমওয়েল ছিলেন ইংল্যান্ডের টিউডর বংশের শাসক অষ্টম হেনরির প্রধান উপদেষ্টা। তাঁর উদ্যোগেই ইংল্যান্ডে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র কায়েম হয়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত রাজদ্রোহের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে টমাস ক্রমওয়েলকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়।
১৩) অ্যাক্ট অফ সুপ্রেমেসি আইন কে, কবে পাস করেন?
উত্তর: ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে টিউডর বংশের শাসক অষ্টম হেনরির চ্যান্সেলর তথা মুখ্য উপদেষ্টা টমাস ক্রমওয়েল অ্যাক্ট অফ সুপ্রেমেসি আইন পাস করেন।
১৪) টমাস হবসের 'লেভিয়াথান' গ্রন্থ রচনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কী ছিল?
উত্তর: সপ্তদশ শতকে ইংল্যান্ডের গৃহযুদ্ধ, পিউরিটান বিপ্লব, রাজা প্রথম চার্লসের শিরশ্ছেদ, অলিভের ক্রমওয়েল নেতৃত্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক সরকারের দুর্নীতিজনিত পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ টমাস হবস্ রাজতন্ত্রকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে ফ্রান্সে নির্বাসনে থাকাকালীন ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে 'লেভিয়াথান' গ্রন্থটি রচনা করেন।
১৫) ম্যান্ডারিন বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: কনফুসীয় দর্শনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন চৈনিক সাম্রাজ্যে সরকারি আমলাদের 'ম্যান্ডারিন' নামে অভিহিত করা হত। অত্যন্ত কঠিন ও নিরপেক্ষ সরকারী পরীক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ম্যান্ডারিনরা নিযুক্ত হতেন।
১৬) চীনে কেন ম্যান্ডারিন ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে?
উত্তর: চীনের ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়, অর্থের যোগান, প্রদেশগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আইন সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি প্রভৃতি বিষয়গুলি দেখাশোনার জন্য ম্যান্ডারিন ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে।
১৭) ইক্তা ব্যবস্থা কী?
উত্তর: 'ইক্তা' শব্দের অর্থ হলো ভাগ বা অংশ। এটি সুলতানি আমলের এক ধরনের ভূমি ব্যবস্থা ও শাসনতান্ত্রিক বিভাজন। দিল্লির সুলতান সামরিক বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের নির্দিষ্ট শর্তে ও কাজের বিনিময়ে বড় বড় ভূখণ্ড দান করতেন। এই ধরনের সামরিক অঞ্চলকে ইক্তা এবং ইক্তার প্রাপককে বলা হত মুক্তি বা ইক্তাদার।
১৮) সিজদা ও পাইবস কী?
উত্তর: সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন রাজতন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য রাজদরবারে যেসব পারসিক অভিবাদন প্রথা চালু করেছিলেন, সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল সিজদা অর্থাৎ সিংহাসনের সামনে নতজানু হওয়া এবং পাইবস অর্থাৎ সুলতানের পদযুগল চুম্বন করা।
১৯) 'মনসব' শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: 'মনসব' শব্দটি হল একটি ফারসি শব্দ। এর অর্থ হলো পদমর্যাদা বা Rank, এই পদমর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিরা পরিচিত ছিল মনসবদার নামে। মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নিজস্ব ভাবনায় ভারতে প্রথম মনসবদারি প্রথা চালু করেন।
২০) 'দাগ' ও 'হুলিয়া' কী?
উত্তর: সেনা ও অশ্বপোষণ সংক্রান্ত মনসবদারদের দুর্নীতি ও অসাধুতা রোধের জন্য মোগল সম্রাট আকবর 'দাগ' ও 'হুলিয়া' প্রথা সূচনা করেন। দাগ হল যুদ্ধাশ্ব চিহ্নিতকরণ ব্যবস্থা এবং হুলিয়া হলো সেনাদের নাম, ঠিকানা ও কাজের বিবরণমূলক দলিল।
২১) 'ওয়াতন জায়গীর' বলতে কী বোঝো?
উত্তর: মুঘল প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হিন্দু জমিদার ও রাজন্যবর্গ বংশানুক্রমিক ভাবে যে জায়গীর ভোগ করতেন, তাকে ওয়াতন জায়গীর বলা হয়।
২২) 'মন্ডল তত্ত্ব' কী?
উত্তর: চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা কৌটিল্যের মতে, "সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী রাষ্ট্র হল প্রকৃতিগত বা স্বভাবজাত শত্রু এবং তার পরবর্তী রাষ্ট্র হল স্বাভাবিক মিত্র" -- এই দৃষ্টিতে রাজা রাষ্ট্রের শত্রু-মিত্র নির্ণয় করবেন। এই রাষ্ট্রতত্ত্ব 'মন্ডল তত্ত্ব' নামে পরিচিত।
২৩) 'সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব' কী?
উত্তর: কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে রাষ্ট্রকে একটি জীবদেহের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন যে, জীবদেহ যেমন তার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে সচল থাকে তেমনই রাস্ট্রও তার সাতটি অঙ্গের মাধ্যমে সুন্দরভাবে পরিচালিত হয়। সেগুলি হল-- স্বামী বা রাজা, অমাত্য, দুর্গ, জনপদ, কোশ, দণ্ড এবং মিত্র। রাষ্ট্রের এই সাতটি পরস্পর সম্পর্কিত অঙ্গ 'সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব' নামে পরিচিত।
২৪) 'স্যাট্রাপি ব্যবস্থা' কী?
উত্তর: অ্যকামেনীয় সাম্রাজ্যে সুশাসনের জন্য সমগ্র সম্রাজ্যকে কতগুলি প্রদেশকে ভাগ করা হয়েছিল। এর শাসনকর্তা বা প্রাদেশিক গভর্নর 'স্যাট্রাপ' নামে পরিচিত এবং পারস্য সাম্রাজ্যে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থা-ই 'স্যাট্রাপি ব্যবস্থা' নামে পরিচিত।
২৫) শরীয়ত কী?
উত্তর: ইসলামিক ধর্মগ্রন্থ কোরানে আল্লাহর বাণীর ভিত্তিতে রচিত মুসলমানদের অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কিত আইনবিধি 'শরীয়ত' নামে পরিচিত। এই শরীয়ত অনুযায়ী রাষ্ট্র শাসন ছিল ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য।
২৬) অনুলোম বিবাহ ও প্রতিলোম বিবাহ কী?
উত্তর: অর্থশাস্ত্রে আট প্রকার বিবাহের উল্লেখ আছে। 'অনুলোম বিবাহ' হলো উচ্চবর্ণের পুরুষ ও নিম্নবর্ণের নারীর মধ্যে বিবাহ এবং 'প্রতিলোম বিবাহ' বলতে নিম্নবর্ণের পুরুষ ও উচ্চবর্ণের নারীর বিবাহকে বোঝায়।
২৭) অর্থশাস্ত্রে কয় প্রকার রাজস্বের কথা বলা হয়েছে এবং কী কী?
উত্তর: অর্থশাস্ত্রে তিন প্রকার রাজস্বের কথা বলা হয়েছে। ক) সীতা-- রাজার খাস জমি থেকে আদায়ীকৃত কর। খ) ভাগ-- প্রজাদের ব্যক্তিগত জমি থেকে উৎপন্ন ফসলের ১/৬ অংশ কর এবং গ) বলি-- বাধ্যতামূলক কর।
২৮) 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থটি কে, কবে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: মহীশুরের পন্ডিত ড: আর. শ্যাম শাস্ত্রী ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত ভাষায় লেখা 'অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থটি আবিষ্কার করেন এবং এটি ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়।
২৯) জাঁ বোঁদার মতে, রাষ্ট্র কী?
উত্তর: ষোড়শ শতকের ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ জাঁ বোঁদার মতে, রাষ্ট্র হল বিষয়সম্পত্তি-সহ কতকগুলি পরিবারের সমষ্টি, যা সার্বভৌম শক্তি ও যুক্তির দ্বারা শাসিত এবং একটি নির্দিষ্ট শক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।
৩০) অষ্টম হেনরি কে ছিলেন?
উত্তর: অষ্টম হেনরি টিউডর রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক ছিলেন এবং তিনি তাঁর পিতা সপ্তম হেনরির পর সিংহাসনে বসেন। ক্যাথলিক গির্জা থেকে ইংল্যান্ডের গির্জাকে পৃথক করে তিনি পরিচিতি লাভ করেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন