মঙ্গলবার, ২৩ মার্চ, ২০২১

মাধ্যমিক ভূগোল, বায়ুমন্ডল, দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রশ্নোত্তর

১) উষ্ণতার তারতম্য অনুযায়ী বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস করো।  ৫ 

উত্তর: উষ্ণতার তারতম্য অনুসারে উল্লম্বভাবে বায়ুমন্ডলকে সাধারণত ছয়টি স্তরে ভাগ করা যায়। যথা- (১) ট্রপোস্ফিয়ার (২) স্ট্রাটোস্ফিয়ার (৩) মেসোস্ফিয়ার (৪) থার্মোস্ফিয়ার বা আয়নোস্ফিয়ার (৫) এক্সোস্ফিয়ার (৬) ম্যাগনেটোস্ফিয়ার। 

(১) ট্রপোস্ফিয়ার: 'ট্রপো' কথার অর্থ পরিবর্তনশীল, তাই ট্রপোস্ফিয়ার বলতে বোঝায় সর্বদা পরিবর্তনশীল মন্ডলকে। বায়ুমন্ডলের সর্বনিম্ন স্তরের গড় উচ্চতা 14 কিমি। ভূপৃষ্ঠ থেকে নিরক্ষীয় অঞ্চলের ঊর্ধ্বে এর উচ্চতা 18 কিমি এবং কমতে কমতে মেরুতে 8 কিমিতে পৌঁছায়। কুয়াশা, মেঘ, বৃষ্টিপাত, ঝড়-বৃষ্টি, যাবতীয় আবহাওয়ার প্রক্রিয়াগুলির সংঘটিত হয় এই স্তরে। এই স্তরকে 'ক্ষুব্ধমন্ডল'ও বলা হয়। এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুর গতিবেগ বৃদ্ধি পায় ও উষ্ণতা ৬.৪ ডিগ্রি হারে হ্রাস পায়। ট্রপোস্ফিয়ার ও স্ট্রাটোস্ফিয়ারের সীমারেখা 'ট্রপোপজ' নামে পরিচিত।

(২) স্ট্রাটোস্ফিয়ার: ট্রপোপজের উর্দ্ধে প্রায় 50 কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত এই স্তরটি বৃষ্টিপাত, মেঘ, ঝড়-ঝঞ্ঝা মুক্ত হওয়ায় 'শান্তবলয়' নামেও পরিচিত। এই স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়। 15 থেকে 35 কিমি উচ্চতার মধ্যে অতিবেগুনি রশ্মি শোষণকারী ওজোন গ্যাসের ঘনত্ব সর্বাধিক বলে, ওই অংশের নাম ওজোন স্তর। স্ট্রাটোস্ফিয়ার ও মেসোস্ফিয়ারের সীমারেখা হল স্ট্রাটোপজ। 

(৩) মেসোস্ফিয়ার: স্ট্রাটোপজের ওপর থেকে 80 কিমি পর্যন্ত মেসোস্ফিয়ার স্তর। এই স্তরে তাপমাত্রা কমতে কমতে --85°C হয় ও বায়ুর চাপ খুব কম থাকে। মেসোস্ফিয়ারের সর্বোচ্চ অংশে যেখানে উষ্ণতা হ্রাস বন্ধ হয়ে সমতাপ স্তরের সৃষ্টি করে, তাকে বলে মেসোপজ। 

(৪) থার্মোস্ফিয়ার: বায়ুমণ্ডলের এই স্তরের বিস্তার মেসোপজ থেকে ভূপৃষ্ঠের উপর 500 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত। উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে উষ্ণতা দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় 1200 ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়। এই স্তরের অপর নাম 'আয়নোস্ফিয়ার'। এই স্তর থেকে বেতার তরঙ্গ প্রতিফলিত হয়ে ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে। 

(৫) এক্সোস্ফিয়ার: বায়ুমণ্ডলের এই স্তরটি 500 থেকে 750 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে 1600 ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়। হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসের পরিমাণ বেশি থাকে। 

(৬) ম্যাগনেটোস্ফিয়ার: ভূপৃষ্ঠ থেকে 1000 থেকে 16000 কিমি উচ্চতায় অবস্থিত এই স্তর এক্সোস্ফিয়ারের ওপরে অবস্থিত। এখানে শুধুমাত্র ইলেকট্রন ও প্রোটন দেখা যায়, এটি একটি চুম্বক ক্ষেত্র। 


২) উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য উষ্ণতা হ্রাস পায় কেন?  ৩ 

উত্তর: বায়ুমণ্ডলের ট্রপোস্ফিয়ার স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা হ্রাস পায়। প্রতি 1 কিমি উচ্চতা বৃদ্ধিতে 6.4°C উষ্ণতায হ্রাস পায়, একে নর্মাল ল্যাপস রেট বলে। কারণ, এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধিতে ধূলিকণার পরিমাণ যেমন কমে তেমনি বায়ুর ঘনত্ব ও চাপ কম বলে বিকিরণের প্রভাব কমে, তাই উষ্ণতাও কমে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চ স্থানের উষ্ণতা কম হয় এবং একই অক্ষাংশে অবস্থিত উচ্চস্থানের উষ্ণতা নিম্নস্থান অপেক্ষা কম হয়। 


৩) এরোসল কাকে বলে?   ২ 

উত্তর: বায়ুতে ভাসমান অতি ক্ষুদ্র ধূলিকণাকে এরোসল বলে। মরু অঞ্চল ও সমুদ্রতীরের অতি সূক্ষ্ম ধুলোবালি, বিভিন্ন কলকারখানার ধাতবকণা ও পোড়া ছাই, আগ্নেয়গিরি থেকে উৎক্ষিপ্ত ছাই এবং উল্কার ধ্বংসাবশেষ প্রভৃতি এরোসেলের উৎস। 


৪) অ্যালবেডো কী?   ২ 

উত্তর: সূর্যরশ্মির তাপীয় ফলের 34% বায়ুমন্ডলে অবস্থিত মেঘপুঞ্জ, ধূলিকণা, ভূপৃষ্ঠ থেকে বিচ্ছুরিত ও প্রতিফলিত হয়ে বৃহৎ তরঙ্গরূপে পুনরায় মহাশূন্যে ফিরে যায়। ফলে তা বায়ুমন্ডলকে উত্তপ্ত করতে পারে না, একে পৃথিবীর অ্যালবেডো বলা হয়। 


৫) স্ট্রাটোস্ফিয়ারকে 'শান্তমন্ডল' বলে কেন?   ৩ 

উত্তর: স্ট্রাটোস্ফিয়ার স্তরের বায়ুতে অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণা ছাড়া কোনোরকম জলীয়বাষ্প থাকে না। ফলে আবহাওয়া শান্ত ও শীতল থাকে। বায়ু নিশ্চল থাকে। মেঘ, ঝড়ঝঞ্জা ও বৃষ্টিপাত হয় না। সেজন্য স্ট্রাটোস্ফিয়ারকে 'শান্তমন্ডল' বলা হয়। শান্ত আবহাওয়ার জন্য এই স্তরের মধ্য দিয়ে জেট বিমানগুলি যাতায়াত করে। বায়ুপ্রবাহ থাকে না বলে জেট বিমানের ইঞ্জিন থেকে নির্গত ধোঁয়া পুচ্ছাকারে সাদা দাগের মত দেখায়। 


৬) ট্রপোস্ফিয়ারকে 'ক্ষুব্ধমন্ডল' বলা হয় কেন?   ২ 

উত্তর: বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন গ্যাসীয় উপাদানের 75% এবং জলীয় বাষ্প, ধূলিকণা ইত্যাদি এই স্তরে যথেষ্ট পরিমাণে থাকে। তাই বজ্রঝড়, ঝড়, বৃষ্টি, কুয়াশা প্রভৃতি আবহাওয়ার যাবতীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সমস্ত প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই স্তরে ঘটে বলে এই স্তরকে 'ক্ষুব্ধমন্ডল' বলা হয়।


৭) কার্যকরী সৌর বিকিরণ বলতে কী বোঝো?   ২

উত্তর: সূর্য থেকে আগত মোট শক্তির 200 কোটি ভাগের 1 ভাগকে যদি আমরা 100% ধরি তবে তার 34% ভূপৃষ্ঠকে কোনোভাবে উত্তপ্ত করতে পারে না। কিন্তু অবশিষ্ট 66% পরিবহন, পরিচলন, বিকিরণ প্রভৃতি পদ্ধতিতে ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে, তাকে কার্যকরী সৌর বিকিরণ বলে।


৮) আয়োনোস্ফিয়ারে বেতার তরঙ্গ প্রতিফলিত হয় কেন?   ২

উত্তর: থার্মোস্ফিয়ার স্তরটির নীচে রয়েছে আয়োনোস্ফিয়ার। এই অংশে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় রশ্মি তড়িদাহিত হয়ে ইলেকট্রনে ভেঙে যায় এবং পজিটিভ ও নেগেটিভ আয়নের প্রাচুর্য ঘটায়। এইসব আয়নের দ্বারা বেতার তরঙ্গ সরাসরি প্রতিফলিত হয়ে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসে।  


৯) "ওজোন স্তরের বিনাশে মানুষের কার্যাবলী অধিক গুরুত্বপূর্ণ" -- ব্যাখ্যা দাও।   ৩

উত্তর: ওজোন স্তরের বিনাশে মানুষের কার্যাবলী অনেকাংশে দায়ী। ইলেকট্রনিক ও কম্পিউটার শিল্পের বিভিন্ন দ্রব্য, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র প্রভৃতি থেকে সৃষ্ট ক্লোরোফ্লোরো কার্বনের প্রভাবে ওজোনস্তরে ছিদ্র সৃষ্টি হচ্ছে এবং ঘনত্ব কমে যাচ্ছে। আন্টার্কটিকা মহাদেশে ওপর ওজোন স্তরের ক্ষয় বা পাতলা হয়ে যাওয়াকে বিজ্ঞানীরা 'ওজন গহবর' নামকরণ করেছেন। মানুষের ব্যবহৃত জিনিসের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ফলে পরোক্ষভাবে ওজোন স্তরের বিরাজ করছে।


১০) বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের গুরুত্ব লেখো।   ৩  

উত্তর: বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের গুরুত্ব - 
(১) বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতির জন্য মেঘ সৃষ্টি হয়। ঘনীভবন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জলীয় বাষ্প থেকে মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশা, তুষার ও তুহিন সৃষ্টি হয়। 

(২) উচ্চ আকাশে জলীয় বাষ্পের ঘনীভবনের ফলে লীনতাপ সৃষ্টি হয়ে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটায়। 

(৩) জলীয়বাষ্প বায়ুর উষ্ণতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। জলীয় বাষ্পের তারতম্যের জন্য উষ্ণতা ও বৃষ্টিপাতের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে।  

১) উষ্ণতার বৈপরীত্য কী?  ২
উত্তর:-  উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে তাকে 'উষ্ণতার বৈপরীত্য' বলে। সাধারণত, শীতকালে পরিষ্কার মেঘমুক্ত আকাশে শান্ত আবহাওয়ায় পর্বতের উপরের অংশের বায়ু দ্রুত শীতল হয়ে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে পর্বতের ঢাল বেয়ে নীচের উপত্যকায় নেমে আসে। ফলে পর্বতের উপরের অংশের তুলনায় নীচের অংশের উষ্ণতা বেশ কম হয়, একে 'বৈপরীত্য উষ্ণতা' বলে। 

২) ইনসোলেশন কী?  ২ 
উত্তর:-  সূর্য থেকে আগত রশ্মি বায়ুমণ্ডল ও ভূপৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে। সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় 6000 ডিগ্রী সেলসিয়াস, যার 200 কোটি ভাগের এক ভাগ ক্ষুদ্র তরঙ্গ রূপে প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিমি বেগে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। একে ইনস্লোশন বা সূর্যরশ্মির তাপীয় ফল বলে। 

৩) সমোষ্ণরেখা কাকে বলে?  ২ 
উত্তর:-  ভূপৃষ্ঠের যেসব স্থানসমূহে বছরের কোন একসময়, সাধারণত জানুয়ারি ও জুলাই মাসে উষ্ণতার গড় প্রায় একইরকম থাকে সেইসব স্থানের উপর দিয়ে যে কাল্পনিক রেখা টানা হয় অর্থাৎ সমান উষ্ণতাযুক্ত স্থানগুলিকে মানচিত্রে যে রেখার মাধ্যমে দেখানো হয়, তাকে সমোষ্ণরেখা বলে। 

৪) গ্রীনহাউস কৃষি কী?  ৩ 
উত্তর:-  তুন্দ্রা অঞ্চলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার জন্য কাচের ঘরের মধ্যে উষ্ণতা বাড়িয়ে যে কৃষি পদ্ধতি লক্ষ্য করা যায়, তাকে গ্রিনহাউস কৃষি বলে। সূর্যরশ্মির ক্ষুদ্র তরঙ্গরূপে এই ঘরে প্রবেশ করলেও তা মাটিতে ধাক্কা খেয়ে বৃহৎ  তরঙ্গরূপে ফিরে যাওয়ার সময় আর বেরোতে পারে না। ফলে কাচের ঘরের মধ্যে উষ্ণতা বাড়ে। এতে বাইরের উষ্ণতার থেকে ভেতরের উষ্ণতা অনেকটা বেড়ে যায়। ফুল, ফল, শাকসবজি চাষে বিশেষ সুবিধা হয়। 

৫) একই অক্ষাংশে অবস্থিত কলকাতার তুলনায় বিলাসপুরের জলবায়ু চরমভাবাপন্ন কেন?  ৩ 
উত্তর:-  প্রকৃতিগত কারণেই জলভাগ ও স্থলভাগের উপর বায়ুর উষ্ণতা সমান নয়। দিনের বেলায় সূর্যকিরণ সমভাবে জল ও স্থলের উপর পড়লেও একই সময়ের মধ্যে জল অপেক্ষা স্থল বেশি তাড়াতাড়ি তাপ শোষণ করে, অন্যদিকে রাতের বেলা জল অপেক্ষা স্থল বেশি দ্রুত তাপ বিকিরণ করে। সমুদ্র থেকে দেশের অভ্যন্তরে দূরত্ব যতই বাড়ে শীত-গ্রীষ্মের উষ্ণতার পার্থক্য ততই বাড়তে থাকে। তাই সমুদ্র থেকে বহু দূরে অবস্থান করার জন্য প্রায় একই অক্ষাংশে অবস্থিত হওয়া সত্বেও কলকাতার তুলনায় বিলাসপুরের জলবায়ু চরমভাবাপন্ন হয়। 

৬) বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং কাকে বলে?  ৩ 
উত্তর:-  সূর্য থেকে বিকিরিত শক্তির প্রায় শতকরা 66 ভাগ ক্ষুদ্র তরঙ্গরূপে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। বৃহৎ তরঙ্গে এই সৌরতাপ বিকিরিত হওয়ার সময় বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইড, জলীয়বাষ্প ও অন্যান্য গ্যাস দ্বারা শোষিত হয়ে পৃথিবীকে উত্তপ্ত রাখে, একে গ্রীনহাউস এফেক্ট বলে। কিন্তু বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসগুলির মাত্রা অতিরিক্ত হয়ে পড়লে পৃথিবী থেকে বিকিরিত তাপের সবটা মহাশূন্যে ফিরে যেতে পারে না। বায়ুমন্ডলের ওই গ্যাসগুলির স্তরে বাধা পেয়ে পুনরায় তা ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে এবং বায়ুমন্ডলকে উত্তপ্ত করে। এইভাবে পৃথিবীর স্বাভাবিক তাপমাত্রা অপেক্ষা উষ্ণতার এই ক্রমবর্ধমান অবস্থাকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলা হয়। 

৭) "পৃথিবীব্যাপী বৃষ্টিপাতের বণ্টনে এল নিনোর প্রভাব দেখা যায়" -- ব্যাখ্যা করো।  ৩ 
উত্তর:-  এল নিনোর প্রভাবে পেরু ও চিলির পশ্চিমাংশে তীব্র নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এই নিম্নচাপের প্রভাবে পেরু ও ইকুয়েডরে প্রচুর বৃষ্টি হয় ও বন্যার সৃষ্টি হয়। আটাকামা মরুভূমিতে বার্ষিক বৃষ্টিপাত 10 থেকে 25 সেমি হলেও এল নিনোর প্রভাবে বছরে 300 থেকে 400 সেমি বৃষ্টিপাত হয়। এছাড়াও এল নিনোর প্রভাবে যেসব অঞ্চল প্রভাবিত হয় সেগুলি হল-- উত্তর ও মধ্য আমেরিকার পশ্চিম উপকূল, উত্তর আমেরিকার উত্তর-পূর্ব ও মধ্য পশ্চিমাংশে ও কানাডায় শীতের প্রকোপ কমে। আবার অস্ট্রেলিয়ার পূর্বাংশে গভীর উচ্চ চপের সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে পূর্ব অস্ট্রেলিয়া, নিউগিনি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফিলিপাইনস, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, বাংলাদেশ প্রভৃতি অঞ্চলে শুষ্ক আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়, অনাবৃষ্টি, খড়া ও গ্রীষ্মে তার প্রভাব সৃষ্টি করে।  

৮) সমচাপরেখা বা আইসোবার কাকে বলে?  ২ 
উত্তর:-  মানচিত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ে একই বায়ুচাপ বিশিষ্ট অঞ্চলগুলিকে কোন কাল্পনিক রেখা দ্বারা যোগ করলে যে রেখা পাওয়া যায়, তাকে সমচাপরেখা বা সমপ্রেষরেখা বলে। সমচাপরেখা কল্পনা ক্ষেত্রে কোন জায়গায় বায়ুচাপের পরিমাণকে সমুদ্রপৃষ্ঠে বায়ুর চাপের পরিবর্তন করতে হয়। 

৯) বাইস ব্যালট সূত্রটি লেখো।  ২ 
উত্তর:-  ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ডাচ আবহবিদ বায়ুচাপের তারতম্যের সঙ্গে বায়ু প্রবাহের সম্পর্ক সম্বন্ধে একটি সূত্র উদ্ভাবন করেন। সূত্রটি হল-- বায়ুপ্রবাহের দিকে পিছন করে দাঁড়ালে ডান দিক থেকে বাম দিকে বায়ুর চাপ কম অনুভূত হয় অর্থাৎ উত্তর গোলার্ধে ডান দিকে উচ্চচাপ হবে এবং বাম দিকে নিম্নচাপ হবে। অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধে বিপরীত অবস্থা হবে, এই সূত্রটির বাইস ব্যালট সূত্র নামে পরিচিত।

১০) কোরিওলিস বল কী?  ২ 
উত্তর:-  ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি গণিতজ্ঞ গ্যাসপার ডি কোরিওলিস -এর মতে, পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য এক দিকবিক্ষেপক শক্তি বা বলের সৃষ্টি হয় যার ফলে পৃথিবীতে স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দগতিতে প্রবাহিত বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত সরল প্রবাহপথ থেকে উত্তর গোলার্ধের ডান দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে যায়। এই দিক বিক্ষেপক শক্তি বা বলকে কোরিওলিস বল বলা হয়। 

১১) ফেরেলের সূত্রটি লেখো।  ২ 
উত্তর:-  ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকান আবহবিদ উইলিয়াম ফেরেল প্রথম এই সূত্রটি আবিষ্কার করে এই সূত্র অনুযায়ী পৃথিবীর আবর্তন ও কোরিওলিস শক্তির জন্য উচ্চচাপ বলয় থেকে নিম্নচাপ বলয় এর দিকে যাওয়ার সময় উত্তর গোলার্ধের ডান দিকে ও দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে যায়। যথা- উত্তর গোলার্ধে আয়ন বায়ু ডান দিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু রুপে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু রূপে প্রবাহিত হয়। 

১২) নিয়ত বায়ু কাকে বলে?  ২
উত্তর:-  যেসকল বায়ু একটি নির্দিষ্ট উচ্চচাপ বলয় থেকে একটি নির্দিষ্ট নিম্নচাপ বলয়ের দিকে সারা বছর নিয়মিতভাবে প্রবাহিত হয়, তাদের নিয়ত বায়ু বলে। 

১৩) আয়ন বায়ুকে বাণিজ্য বায়ু বলা হয় কেন?  ২ 
উত্তর:- আয়ন বায়ু সারাবছর নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হয়, তাই আগেকার দিনে নাবিকেরা আয়ন বায়ুর গতিপথ ধরে পালতোলা জাহাজে বাণিজ্য চালাত। সেই কারণে আয়ন বায়ুকে বাণিজ্য বায়ু বলা হয়। 

১৪) ITCZ কাকে বলে?  ২ 
উত্তর:-  নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছর একটি স্থায়ী নিম্নচাপ বলয় অবস্থান করে। নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের উভয়পাশে ক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় অবস্থান করতে দেখা যায়। তাই নিরক্ষীয় নিম্নচাপ অঞ্চলে উত্তর দিক থেকে আগত উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু এবং দক্ষিণ দিক থেকে আগত দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়ে এখানে এসে মিলিত হয়, এই কারণে এই অঞ্চলকে আন্তঃ ক্রান্তীয় অভিসরণ অঞ্চল বা ITCZ (Inter Tropical Convergence Zone) বলা হয়। 

১৫) অশ্ব অক্ষাংশ কাকে বলে?  ২
উত্তর:-  উত্তর গোলার্ধে আটলান্টিক মহাসাগরে বিস্তৃত কর্কটীয় শান্তবলয় (২৫℃ --৩৫℃) অশ্ব-অক্ষাংশ নামে পরিচিত। পূর্বে যখন পালতোলা জাহাজের সাহায্যে বাণিজ্য করা হতো তখন জাহাজ বায়ুপ্রবাহের অভাবে গতিহীন হয়ে পড়ত। তখন জাহাজকে হালকা করার জন্য বেশ কিছু ঘোড়াকে নাবিকগণ জলে ফেলে দিত। তাই কর্কটীয় শান্তবলয় 'অশ্ব-অক্ষাংশ' নামে পরিচিত। 

১৬) গর্জনশীল চল্লিশা কাকে বলে?  ২ 
উত্তর:  দক্ষিণ গোলার্ধে পশ্চিমা বায়ু বিভিন্ন সমাক্ষরেখা বিভিন্ন প্রকার শব্দ করে প্রবাহিত হয় বলে সমাক্ষরেখা অনুসারে পশ্চিমা বায়ু বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। 40 ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশের উপর দিয়ে পশ্চিমা বায়ু প্রচন্ড বেগে প্রবাহিত হয়, তাই একে গর্জনশীল চল্লিশা বলে। 

১৭) মেরু বায়ুর দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।  ২ 
উত্তর:-  মেরু বায়ুর দুটি বৈশিষ্ট্য হলো- (১) মেরু বায়ু উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব মেরু বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব মেরু বায়ুরূপে প্রবাহিত হয়‌ (২) এই বায়ু মেরুদেশ থেকে প্রবাহিত হয় বলে অত্যন্ত শীতল ও শুষ্ক হয়। 

১৮) তুষার ভক্ষক কী এবং কেন?  ২ 
উত্তর:-  উষ্ণ ও শুষ্ক স্থানীয় বায়ু চিনুককে তুষার ভক্ষক বলা হয়। শীতকাল ও বসন্তকালে রকি পর্বতের অনুবাত ঢাল দিয়ে প্রেইরি অঞ্চলের দিকে এই বায়ু প্রবাহিত হয়। পশ্চিম দিক থেকে আগত এই বায়ু পর্বতের অনুবাত ঢাল দিয়ে নেমে আসায় এই বায়ুর উষ্ণতা কিছুক্ষণের মধ্যে ১৫℃ -- ২০℃ বেড়ে যায়। এই বায়ুর উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার ফলে অনুবাত পার্শ্বের বরফ গলে যায়। তাই রেড ইন্ডিয়ানরা এই বায়ুকে 'চিনুক' বা 'তুষার ভক্ষক' নাম দিয়েছেন। 

১৯) অ্যানাবেটিক বায়ু কাকে বলে?  ২ 
উত্তর:-  পার্বত্য অঞ্চলে দিনের বেলা সৌর বিকিরণে উপত্যকার দুইপাশের ঢালের উপর বায়ু যে পরিমান উষ্ণ হয়, উপত্যকার মধ্যভাগের উপরের বায়ু ওই একই উচ্চতায় ততটা উষ্ণ হয় না, শীতল থাকে এবং উচ্চচাপের সৃষ্টি হয়।‌ এই উচ্চচাপের বায়ুর চাপেই পর্বতগাত্রের উপর উষ্ণবায়ু পর্বতগাত্র বেয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকে। এই প্রকার বায়ুকে উপত্যকা বায়ু বা অ্যানাবেটিক বায়ু বলা হয়। 

২০) ক্যাটাবেটিক বায়ু কাকে বলে?  ২
উত্তর:-  পার্বত্য অঞ্চলে রাত্রিবেলায় তাপ বিকিরণের ফলে পার্বত্য উপত্যকার উপরের বায়ু নীচের বায়ুর থেকে বেশি শীতল হয়। তখন পর্বতের ঢাল বেয়ে শীতল ও ভারী বায়ু উপত্যকার দিকে নেমে আসে। এই প্রকার বায়ুকে ক্যাটাবেটিক বায়ু বা পার্বত্য বায়ু বলা হয়। 

২১) ঘূর্ণবাত কাকে বলে?  ২ 
উত্তর:-  স্বল্প পরিসরে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হঠাৎ বায়ুর চাপ কমে গেলে সেই অঞ্চলের বায়ু ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং তাপের সমতা রক্ষার জন্য পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বায়ু চক্রাকারে নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে পর্যায়ক্রমে প্রবেশ করে উষ্ণ ও হালকা হয়ে উপরের দিকে কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়তে থাকে। এইরূপ নিম্নচাপ কেন্দ্রমুখী প্রবল বায়ুপ্রবাহকে ঘূর্ণবাত  বলে। 
২২) প্রতীপ ঘূর্ণবাত কাকে বলে?  ২ 
উত্তর:-  হিমমন্ডল বা নাতিশীতোষ্ণ মন্ডলের অল্প পরিসরে অধিক শীতলতার জন্য উচ্চচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। তখন সেখান থেকে বাইরের নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে শীতল ও শুষ্ক বায়ু প্রবল বেগে কুন্ডলী আকারে চারিদিকে প্রবাহিত হয়। এইরপ কেন্দ্র বহির্মুখী ও নিম্নগামী ঘূর্ণায়মান বায়ুপ্রবাহকে প্রতীপ ঘূর্ণবাত বলে। 

২৩) জেট বায়ুর দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।  ২ 
উত্তর:-  জেট বায়ুর দুটি বৈশিষ্ট্য হলো- (১) জেট বায়ু নলের মতো সরু সংকীর্ণ পথে প্রবাহিত হয়। (২) এই বায়ুর গতিবেগ অত্যন্ত বেশি, ঘণ্টায় ১৫০ থেকে ৩০০ কিমি। 


১) বিভিন্ন প্রকার বৃষ্টিপাতের শ্রেণীবিভাগ করে যেকোনো একটি সম্পর্কে চিত্রসহ আলোচনা করো।  ৫ 
উত্তর:-  বায়ুর ঊর্ধ্বগমন ও শীতলীকরণ পদ্ধতির তারতম্য অনুসারে বৃষ্টিপাতকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- পরিচলন বৃষ্টিপাত, শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণ বৃষ্টিপাত। 

শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাতের বর্ণনা

সংজ্ঞা: জলীয় বাষ্পপূর্ণ আর্দ্র বায়ু কোন পর্বত বা উচ্চভূমিতে বাধাপ্রাপ্ত হয় উপরে উঠে শীতল ও ঘনীভূত হয়ে পর্বতের প্রতিবাদ ঢালে যে বৃষ্টি ঘটায়, তাকে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি বলে। 

উৎপত্তি বা পদ্ধতি: সমুদ্র থেকে আগত জলীয় বাষ্পপূর্ণ আর্দ্র বায়ু ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে প্রবাহিত হওয়ার সময় আড়াআড়িভাবে কোন পর্বত বা উচ্চভূমির গাত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয় উপরে উঠে যায়। ঊর্ধ্বগামী এই বায়ু প্রসরিত ও শীতল হতে থাকে। এরপর এই শীতল বায়ুর মধ্যে উপস্থিত জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে পর্বতের প্রতিবাত ঢালে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। পর্বতের গাত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে এই বৃষ্টিপাত হয় বলে একে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত বলে। 
    পর্বতের বিপরীত দিকে অর্থাৎ অনুবাত ঢালে বায়ু ক্রমশ নিচের দিকে নামে ও উষ্ণ হয়। ফলে এই বায়ু ঘনীভূত হতে পারেনা, এইজন্য পর্বতের অনুবাত ঢালে তেমন বৃষ্টি হয় না বলে একে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল বলে। 

 
উদাহরণ:  
(১) মেঘালয়ের খাসি পাহাড়ে চেরাপুঞ্জির মৌসিনরামে পৃথিবীর মধ্যে সর্বাধিক বৃষ্টিপাত হয়‌। এই পাহাড়ের বিপরীত দিকে অর্থাৎ অনুবাত ঢালে অবস্থিত শিলং বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

(২) পশ্চিমঘাট পর্বতের পশ্চিম ঢালে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত হয় কিন্তু পূর্ব ঢালে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। 


২) ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ুর অবস্থান ও প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি বর্ণনা করো।   ৫ 
উত্তর:- 
অবস্থান
(১) অক্ষাংশগত: উভয় গোলার্ধে 10 ডিগ্রি থেকে 30 ডিগ্রী উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে মহাদেশগুলির পূর্বে ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু দেখা যায়। 
(২) মহাদেশগত: 
এশিয়ার মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ, দক্ষিণ চীন প্রভৃতি। এছাড়াও আফ্রিকার পশ্চিম অংশ, দক্ষিণ আমেরিকার ভেনজুয়েলা, ব্রাজিলের পূর্ব উপকূল, ওশিয়ানিয়ার উত্তর, অস্ট্রেলিয়া, কুইন্সল্যান্ড প্রভৃতি অঞ্চলে এই প্রকার জলবায়ু দেখা যায়। 

বৈশিষ্ট্য:
(১) উষ্ণতা: গ্রীষ্মকালীন গড় উষ্ণতা 27 ডিগ্রি থেকে 32 ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতকালীন গড় উষ্ণতা 10 ডিগ্রি থেকে 27 ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। বার্ষিক উষ্ণতার প্রসর প্রায় 15 ডিগ্রী সেলসিয়াস হয়। 

(২) বৃষ্টিপাত: বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত 100 সেমি থেকে 150 সেমি হয়। মৌসুমী বায়ুর অনিশ্চয়তার কারণে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হয়। 

(৩) বিপরীতমুখী বায়ুপ্রবাহ: মৌসুমী জলবায়ু মৌসুমী বায়ু দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। এই অঞ্চলে ঋতুভেদে ভিন্নধর্মী বায়ু প্রবাহিত হয় অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ও শীতকালে শুষ্ক উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বায়ুপ্রবাহের 180° পরিবর্তন হয়। 

(৪) ঋতু পরিবর্তন: মৌসুমী জলবায়ুতে চারটি ঋতু গ্রীষ্মকাল (মার্চ থেকে মে), বর্ষা (জুন থেকে সেপ্টেম্বর), শরৎ (সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর) ও শীত (ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) পর্যায়ক্রমে আবর্তিত হয়। 

(৫) প্রকৃতি: মৌসুমি জলবায়ুর প্রধান চরিত্র হল- উষ্ণ ও আর্দ্র গ্রীষ্মকাল এবং শুষ্ক ও মৃদু শীতল শীতকাল। 


৩) জেট বায়ুপ্রবাহের সঙ্গে মৌসুমী বায়ুর সম্পর্ক আলোচনা করো।   ৫ 
উত্তর:-  মৌসুমী বায়ু প্রবাহের উপর জেট বায়ু প্রবাহের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমী ঋতুতে বায়ুমণ্ডলের উচ্চস্তরে প্রবল পূবালী বায়ু প্রবাহিত হয়। এই বায়ুপ্রবাহের মধ্যে প্রায় 15 কিমি উচ্চতায় একটি সুস্পষ্ট ক্রান্তীয় পূবালী জেট প্রবাহ অবস্থান করে। গ্রীষ্মের শেষে দক্ষিণ ভারতের উপর এই জেট প্রবাহটির আগমন হলে মৌসুমী বায়ু প্রবাহের সূচনা হয়। 

(১) দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ও জেট বায়ুপ্রবাহ:  সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর অংশবিশেষ মাত্র এক থেকে দেড় কিমি উচ্চতায় অবস্থিত একটি জেটরূপে প্রবাহিত হয়। পশ্চিমে আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে 10 ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে এই ধরনের আরেকটি বায়ুপ্রবাহের সন্ধান পাওয়া যায়। ভারতের সাধারণত 9 থেকে 12 কিমি উচ্চতা দিল্লি থেকে গুয়াহাটির দিকে প্রচন্ড গতিতে জেট বায়ুপ্রবাহ বয়ে চলেছে। ভারতে যখন দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয় তখন 13 ডিগ্রি অক্ষাংশের কাছাকাছি পূর্ব থেকে পশ্চিমে 11 কিমি উচ্চতায় অপর একটি জেট আত্মপ্রকাশ করে। এই পূবালী জেট ভারতের মাঝ বরাবর অবস্থান করে নিম্নচাপ সৃষ্টি করলে ভারতে মৌসুমী বায়ুর আগমন ঘটে। উপক্রান্তীয় পশ্চিমী জেট সরে গেলে ভারতে মৌসুমী বিস্ফোরণ ঘটে। 

(২) উত্তর-পূর্ব মৌসুমি ও জেট বায়ুপ্রবাহ:  নিম্ন বায়ুমণ্ডলের পূবালী জেট বায়ুর প্রভাব থাকলেও ঊর্ধ্ব ট্রপোস্ফিয়ারের পশ্চিমা বায়ুর প্রভাব থাকে। পশ্চিমা বায়ু শীতকালীন পশ্চিমী ঝামেলাকে নিয়ন্ত্রণ করে। পশ্চিমী জেট বায়ু ঘূর্ণবাতগুলিকে অধিক সক্রিয় করে তোলে এবং প্রবল বজ্রঝড়ের সৃষ্টি করে, একে প্রাক-মৌসুমি বৃষ্টিপাত বলে। 


৪) উদাহরণসহ বায়ুপ্রবাহের শ্রেণীবিভাগ করো।   ৫ 
উত্তর:-  ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে বা অনুভূমিকভাবে বায়ুচলাচলকে বলে বায়ুপ্রবাহ। 

বায়ুপ্রবাহের শ্রেণীবিভাগ:  উৎপত্তি ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ভূপৃষ্ঠের বায়ুপ্রবাহকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। (১) নিয়ত বায়ু (২) সাময়িক বায়ু (৩) স্থানীয় বায়ু (৪) আকস্মিক বায়ু। 

(১) নিয়ত বায়ু:  পৃথিবীপৃষ্ঠে সারা বছর ধরে যে স্থায়ী উচ্চচাপ বলয় থেকে স্থায়ী নিম্নচাপ বলয়ের দিকে নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট পথে এবং নির্দিষ্ট গতিবেগে প্রবাহিত হয়, তাকে নিয়ত বায়ু বলা হয়। প্রবাহের দিক, গতি ও অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে নিয়ত বায়ুকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।। যথা-(i) আয়ন বায়ু (ii) পশ্চিমা বায়ু (iii) মেরু বায়ু। 

(২) সাময়িক বায়ু:  দিন বা রাতের একটা নির্দিষ্ট সময়ে অথবা বছরের কোন এক নির্দিষ্ট ঋতুতে ভূপৃষ্ঠে কতকগুলি বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়, একে সাময়িক বায়ু বলে। বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা ও চাপের পার্থক্যই সাময়িক বায়ু প্রবাহের কারণ। প্রবাহের স্থান ও দিনের তারতম্য অনুসারে সাময়িক বায়ুকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। যথা- (i) স্থলবায়ু,  (ii) সমুদ্র বায়ু, (iii) মৌসুমী বায়ু এবং (iv) উপত্যকা ও পার্বত্য বায়ু।  

(৩) স্থানীয় বায়ু:  ভূপৃষ্ঠের কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থানীয় ভূ প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের পার্থক্যের জন্য বছরের নির্দিষ্ট সময়ে স্থানীয় চাপ ও তাপের তারতম্য ঘটে। এই কারণে ভূপৃষ্ঠের নির্দিষ্ট অঞ্চলে কতগুলো বায়ু প্রবাহিত হয়। এদের স্থানীয় বায়ু বলে। বায়ুর প্রকৃতি অনুসারে স্থানীয় বায়ুকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা- (i) উষ্ণ স্থানীয় বায়ু (ফণ, চিনুক, সিরোক্কো, হারমাট্টান, খামসিন, সাইমুম, লু, আঁধি) (ii) শীতল স্থানীয় বায়ু (বোরা, জোন্ডা, মিস্ট্রাল,পম্পেরো)। 

(৪) আকস্মিক বায়ু:  হঠাৎ বায়ুচাপের পরিবর্তনে আকস্মিক ও অনিয়মিতভাবে প্রবল বেগে যে বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে আকস্মিক বায়ু বলে। কেন্দ্রে চাপের তারতম্যের ওপর নির্ভর করে আকস্মিকভাবে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। যথা- (i) ঘূর্ণবাত  (ii) প্রতীপ ঘূর্ণবাত। 


৫) নিরক্ষীয় অঞ্চলে পরিচলন বৃষ্টি কেন ঘটে?  ৩  
উত্তর:-  নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রায় প্রতিদিন বিকেল চারটের সময় পরিচলন পদ্ধতিতে বৃষ্টি হয়। নিরক্ষীয় অঞ্চলে পরিচলন বৃষ্টিপাত ঘটার কারণগুলি হল-- 

(১) নিরক্ষীয় অঞ্চলে জলভাগের বিস্তার সবচেয়ে বেশি।  
(২) নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছর সূর্য লম্বভাবে আপতিত হয়। তাই এই অঞ্চলে উত্তাপ অনেক বেশি।  
(৩) জলভাগ থেকে জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে এই অঞ্চলের বায়ু হালকা হয়ে সর্বদাই উপরে উঠতে থাকে এবং লীনতাপ ত্যাগ করে ঘনীভূত হয়।। ঘনীভবনের ফলে লীনতাপ বায়ুকে আরও উপরে তুলে দেয়। তাই বজ্রবিদ্যুৎ-সহ মেঘের সঞ্চার ঘটে। এই বজ্রগর্ভ মেঘ থেকে নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রতিদিন পরিচলন পদ্ধতিতে বৃষ্টিপাত ঘটে।  
(৪) নিরক্ষীয় অঞ্চলে স্বাভাবিক উদ্ভিদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে বাষ্পমোচনের হার বেশি হয় এবং বায়ুতে জলীয় বাষ্পের মাত্রা বৃদ্ধি পায় ও ঘনীভূত হয়ে পরিচালন বৃষ্টিপাত ঘটে থাকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন