শুক্রবার, ২৬ মার্চ, ২০২১

মাধ্যমিক ইতিহাস - দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রশ্নোত্তর

 ১) উনবিংশ শতাব্দী বাংলায় নবজাগরণ ও তার চরিত্র সম্পর্কে যা জানো লেখো।   ৮ 

উত্তর: 

ভূমিকা:- পাশ্চাত্য সভ্যতার সংস্পর্শে এসে উনিশ শতকে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে এক যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী আলোড়নের সূচনা হয়। তৎকালীন ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি-- জীবনের সর্বক্ষেত্রে এর প্রভাব অনুভূত হয়। ইতালির নবজাগরণের সঙ্গে তুলনা করে অনেকে বাংলার এই জাগরণকে 'বঙ্গীয় নবজাগরণ' বলে অভিহিত করেছেন। অধ্যাপক সুশোভন সরকার এই জাগরণকে 'রেনেসাঁ' বলে অভিহিত করেছেন।

প্রেক্ষাপট:- নবজাগরণের স্রষ্টা কারা-- এ নিয়ে বিতর্ক আছে। এ ব্যাপারে স্বভাবতই সর্বপ্রথমে রামমোহন রায়ের নাম মনেে পড়ে। তবে মার্কিন গবেষক ডেভিড কফ বঙ্গীয় নবজাগরণের ব্যাপারে রামমোহন বা ডিরোজিওকে কোন কৃতিত্ব দিতে রাজি নন। তাঁর মতে, ভারতীয় নবজাগরণের পথিকৃৎ হলেন ব্রিটিশ পুরাতত্ত্ববিদ। 

     মেকলের নীতি ছিল বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা; বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা চর্চা শুরু হলে শিক্ষিত বাঙালি সম্প্রদায়, অভিজাত শ্রেণী, মধ্যবিত্ত শ্রেণী প্রভৃতিদের  মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার সম‍্যক প্রভাব পড়ে। এই নব্য বাঙালিরা পশ্চিমের জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও জীবনধারার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। 

বাংলার রেনেসাঁ:- পশ্চিমের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পশ্চিমের দর্শন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলা প্রভৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই নব্য বাঙালিরা সমাজে এক পরিবর্তন নিয়ে আসে। বাংলার এই সামাজিক পরিবর্তনকেই ঐতিহাসিকেরা নামকরণ করেছেন বাংলার নবজাগরণ বা বাংলার রেনেসাঁ। 

সীমাবদ্ধতা:- বাংলার এই নবজাগরণ কেবলমাত্র মধ্যবিত্ত ও কিছু ক্ষেত্রে উচ্চবিত্ত সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় এই আন্দোলনকে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হন। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা কেশবচন্দ্র সেনের মতো পণ্ডিতরা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন কিন্তু এরা প্রত্যেকেই প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রের ভিত্তিতে সমাজকে সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। অভিজাত ও সমাজের মুখ্য রাজা রাধাকান্ত দেবও হিন্দু সমাজের সংস্কার নিয়েই চিন্তা করতেন, আবার ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুধুমাত্র সকল শ্রেণীর হিন্দুদের জন্যই সংস্কৃত কলেজের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন। এতসব সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও এই দীর্ঘ সময় ধরে যে সমাজসংস্কারমূলক কর্মকান্ড বিভিন্ন মনীষীদের মধ্যে চলে তার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। ব্রাহ্মণদের শিক্ষা চর্চার কেন্দ্র সাংস্কৃত কলেজ আপামর হিন্দুদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া সেই সময়ে সাধুবাদের যোগ্য অথবা সতীদাহ রদ বা বিধবা বিবাহ প্রবর্তন সবই নবজাগরণের ফল। এই নবজাগরণের আলো বাংলা থেকেই সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। অধ্যাপক অনিল শীল এই আন্দোলনকে 'এলিটিস্ট আন্দোলন' বলে অভিহিত করেছেন।

শহরকেন্দ্রিকতা:- এই নবজাগরণের প্রভাব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিল কলকাতা নির্ভর, কখনো তার আশেপাশের শহরতলীতে এই আন্দোলনের প্রভাব দেখা দিলেও বাংলার বিপুলসংখ্যক গ্রামে এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। 

সমালোচনা:- বঙ্গীয় নবজাগরণকে ইতালির রেনেসাঁর সঙ্গে তুলনা করে তাকে রেনেসাঁ বলে অভিহিত করার ব্যাপারে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠীর মতে, "বঙ্গীয় নবজাগরণের সঙ্গে ইতালির রেনেসাঁর তুলনা অর্থহীন।" ইতালির নবজাগরণের কেন্দ্র ফ্লোরেন্সের সঙ্গে কলকাতার তুলনা চলে না। ইতালির নবজাগরণ ঘটেছিল স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশে। বাংলার নবজাগরণের কেন্দ্র কলকাতা ছিল বিদেশি শাসনাধীন, তাই এখানে নবজাগরণের বিকাশ স্বাভাবিক ছিল না। 

উপসংহার:- স্যার যদুনাথ সরকারের মতে, "কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর ইউরোপে রেনেসাঁ দেখা দেয়, উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণ ছিল তদপেক্ষা ব্যাপক, গভীর এবং অধিকতর বৈপ্লবিক। এই নবজাগরণ ছিল প্রকৃতই একটি রেনেসাঁ।" বঙ্গীয় নবজাগরণের স্রষ্টারা ছিলেন সামন্ত, জমিদার ও ইংরেজ সৃষ্ট শিক্ষিত ভদ্রলোক। পৃথিবীর সব দেশের ইতিহাসে তাই হয়, ছোটলোকদের রেনেসাঁ পৃথিবীর কোনো দেশেই হয়নি; এমনকি ইতালিতেও নয়। পাণ্ডিত্যপূর্ণ দর্শন ঐতিহ্যের সঙ্গে কোন যুগেই আমজনতার পরিচয় থাকে না। পৃথিবীর সব দেশেই প্রাচীন ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় জাগরণ সংঘটিত হয়-- ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। পরাধীন দেশে ঔপনিবেশিক শাসনে বঙ্গীয় নবজাগরণ পূর্ণ ভাবে বিকশিত হতে পারেনি ঠিকই, তবুও এর গতিশীলতা, সৃজনশীলতা ও প্রাণশক্তিকে কোনভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।


২) শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ সম্পর্কে আলোচনা করো।   ৪ 

উত্তর: 

ভূমিকা:- খ্রিস্টান মিশনারী, ব্রাহ্মসমাজ ও নব্য বঙ্গীয়দের দ্বারা উনিশ শতকে হিন্দুধর্ম যখন নানা দিক থেকে আক্রান্ত এবং বাংলায় বিভিন্ন কুসংস্কারের গোঁড়ামিতে যখন নিশ্চল তখন পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব (১৮৩৬--৮৬) 'সর্বধর্ম সমন্বয়' এর মধ্য দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়কে এক নতুন পথ দেখান। 

শিবজ্ঞানে জীবসেবা:- শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব অতি সরল ও সহজ ভাষায় এবং উপমার সাহায্যে মানুষের মধ্যে ধর্মীয় চিন্তাধারা ও মতাদর্শের কথা বলেছেন। তিনি তাঁর নিজের জীবন ও সাধনার মধ্য দিয়ে সকল ধর্মের ওপর উঠে সকল ধর্মকে নিজের মতো করে নিয়ে বলেছিলেন যে ঈশ্বর সকল মানুষের মধ্যেই বিরাজ করেন। জীবকে তিনি দয়া-দাক্ষিণ‍্য করার কথা বলেননি, তিনি বলেছেন 'শিবজ্ঞানে জীবসেবা' -র কথা। তিনি সংসার ত্যাগ করতে বলেননি-- ত্যাগ করতে বলেছেন সংসারের আসক্তি; কর্ম ত‍্যাগের কথা বলেননি-- বলেছেন নিষ্কাম কর্মের কথা। 

যত মত তত পথ:- শ্রীরামকৃষ্ণ সব সাধনার পথকেই সত্য ও সঠিক বলেছেন। হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, শাক্ত, বৈষ্ণব প্রভৃতি সকল ধর্মেই সাধনার মধ্য দিয়ে ঈশ্বর লাভ করা সম্ভব কিন্তু তাই বলে সকল ধর্মকে একসঙ্গে করে সাধনা করার কোন প্রয়োজন নেই। 

ভক্তি দ্বারা ঈশ্বর লাভ:- শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাছে আন্তরিক ভক্তি দ্বারা ঈশ্বর সাধনা করা ও ঈশ্বর লাভ হল বড়ো কথা, এরজন্য মূর্তিপূজা, যাগযজ্ঞ, অনুষ্ঠান-আড়ম্বর, শাস্ত্রচর্চা বা আচার-অনুষ্ঠানের কোনো দরকার নেই। 

উপসংহার:- তাঁর জীবন ও সাধনা প্রমাণ করে যে হিন্দুরা পৌত্তলিক নয়, তারা মৃন্ময়ীতে চিন্ময়ীর উপাসনা করে, ভগবান লাভই জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য, সাধনমার্গের সব পথই সত্য ও অভ্রান্ত। মানুষকে পাপী বলা অন্যায় কারণ, আত্মা নিষ্পাপ ও অবিনশ্বর; সত্য উপলব্ধির জন্য তাকে কৃচ্ছসাধন নয়, আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা সম্ভব।


৩) উনিশ শতকের নারী সমাজ সম্পর্কে 'বামাবোধিনী পত্রিকা' থেকে যে চিত্র পাওয়া যায় তা আলোচনা করো।   ৪ 

উত্তর:

ভূমিকা:- ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত উমেশচন্দ্র দত্ত সম্পাদিত 'বামাবোধিনী' পত্রিকায় রক্ষণশীল এবং উদারনৈতিক -- দুই ধরনের লেখক লেখিকারাই লিখতেন; এই পত্রিকায় প্রকাশিত হত ধর্ম, ইতিহাস, বিজ্ঞান, স্ত্রী-শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ।  পত্রিকাটির উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন অন্তঃস্থ মহিলাদের শিক্ষাদান। 

(১) নারীসমাজ ও কুপ্রথা:- তৎকালীন নারীসমাজে পর্দা প্রথা প্রচলিত ছিল, তাছাড়া ছিল বাল্যবিবাহ বহু বিবাহ ব্যবস্থা। এই সময় বিধবা বিবাহের প্রসার বিশেষ ছিল না, নারীরাও সমাজে বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত হয়নি। 

(২) নারীসমাজ ও শিক্ষা:- বামাবোধিনী পত্রিকা থেকে জানা যায় যে, নারীসমাজের প্রগতিশীলতার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক ছিল রক্ষণশীল সমাজ, তারা মনে করত নারীসমাজ শিক্ষিত হয়ে উঠলে তারা বহির্মুখী হয়ে পড়বে এবং গৃহশান্তি নষ্ট হবে; সমকালীন সমাজের শিক্ষিকা নারীকে 'অশুভত্বের প্রতীক' বলে মনে করা হতো। 

(৩) সম্পত্তি ও নারীসমাজ:- এই সময় নারীরা অর্থনৈতিক দিক থেকে ছিল পরাধীন, সম্পত্তিতে নারীর অধিকার ছিল না। 

(৪) নারীদের পেশা গ্রহণ:- শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের আগমন সমাজে নতুন আলো নিয়ে আসে এবং বালিকা বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের শিক্ষা গ্রহণ; ডাক্তারি শিক্ষা গ্রহণ করে পেশায় নিযুক্ত ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসাবে চন্দ্রমুখী বসু, কাদম্বিনী গাঙ্গুলী, কামিনী সেন প্রমুখের কথা বলা যায়। 

উপসংহার:- বামাবোধিনী পত্রিকা থেকে পাওয়া যায়, তৎকালীন নারীসমাজের চিত্রটি ছিল প্রগতিশীল সমাজের চিত্র; তথাপি গ্রামবাংলার প্রথা ও কুসংস্কারের অন্ধকারেও এক বিশাল নারী সমাজ ছিল এ কথা বলা যায়। 


৪) 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' তৎকালীন সমাজচিত্রটি কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে তা আলোচনা করো।   ৪ 

উত্তর: 

ভূমিকা:- 'হুতোম প্যাঁচার নকশা'র (১৮৬২ খ্রি:) রচয়িতা ছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ, যিনি কলকাতার এক জমিদার সন্তান। এটি এক ধরনের গদ্য রচনা। একে ঊনবিংশ শতকের কলকাতার একটি সমাজদর্পণ বলা যায়। 

(১) তৎকালীন সমাজচিত্র:- হুতোম প্যাঁচার নকশায় তৎকালীন কলকাতার সমাজ জীবনে সংঘটিত দুর্নীতির ছবি যেমন প্রকাশ পেয়েছে তেমনি প্রকাশ পেয়েছে কপটতা ও ভন্ডামীর চালচিত্র, এগুলি নিয়েই ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ এই গ্রন্থে শানিত হয়েছে। 

(২) ঘটনা চিত্র:- এই গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে- মাতাল, উমেদার, ফোঁটাতিলককাটা বোষ্টনের কাহিনী, মোসাহেব পরিবেষ্টিত জমিদারদের কাহিনী, শ‍্য শ্যারি-শ‍্যাম্পেনের মজলিস পাদ্রী কবি ও বাবু সমাজের কাহিনী বলা যায় তৎকালীন সমাজের দ্বিচারিতা ও কেচ্ছা সমৃদ্ধ দিকগুলি এই গ্রন্থে তুলে ধরা হয়। 

(৩) গ্রন্থটির বৈশিষ্ট্য:- হুতোম প্যাঁচার নকশায় প্রকাশিত তথ্যের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল-- (ক) তৎকালীন কলকাতার সমাজচিত্রের ইতিহাস তুলে ধরা বিশেষ করে কলকাতার বাবু কালচারের ছবি। (খ) এটি একটি তৎকালীন নির্ভরযোগ্য সামাজিক দলিল। 

উপসংহার:- ঊনবিংশ শতকের কলকাতার ধনী, মধ্যবিত্ত এবং সাধারন সমাজে যে ভন্ডামি তিনি দেখেছেন তার ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের কষাঘাতের মধ্য দিয়ে সমাজ সংস্কারের কাজ করেছেন। 


৫) 'নব বেদান্ত' সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাধারা আলোচনা করো।   ৪ 

উত্তর: 

ভূমিকা:- উনিশ শতকে ধর্মসংস্কার আন্দোলনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো 'নব বেদান্ত'। এটি ছিল স্বামী বিবেকানন্দের ধর্ম, কর্ম ও সাধনার মূল ভিত্তি। স্বামীজীর সকল বার্তায় হল বেদান্ত বা উপনিষদের শাশ্বত বার্তা; তার গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে সেই বার্তা বাস্তবে প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

স্বামীজীর চিন্তাধারা:- বেদান্তের মধ্য দিয়ে উদ্ভাসিত হয় সহনশীলতা, সেবাকর্ম, উন্নয়ন এবং জাগরণের চিন্তাধারা। বেদান্ত অনুসারে ঈশ্বরই সকল মানব এবং তার মত ও পথকে ধারণ করে আছে। স্বামীজীর সকল বার্তার মধ্যে নিহিত আছে বেদান্তের বার্তা; তিনি ভারতের অধঃপতনের জন্য দায়ী করেন জাতিভেদ প্রথা ও অস্পৃশ্যতাকে। জ্ঞানযোগের সঙ্গে কর্মযোগের সমন্বয় সাধনের কথা বলা হয়, তিনি বলেন ' শিবজ্ঞানে জীবসেবা'। তিনি সমাজ ও সংস্কারের কাজে তাঁর বেদান্তের ভাবনাকে তুলে ধরেন, তিনি বলেন সাধারণ মানুষের সেবার মধ্যে নিহিত আছে ব্রহ্মের সেবা; তিনি তাঁর 'নব বেদান্তে' সংসার ধর্ম ও পারস্পরিক ধর্মকে আলাদা করে দেখেননি। তাঁর বাণীতে-- 

"সম্মুখে তোমার ছাড়ি / কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর 

জীবে প্রেম করে যেইজন / সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।"

উপসংহার:- স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর 'নব বেদান্ত' বাদের দ্বারা মানুষকে মুক্তির এক নতুন পথের সন্ধান দেন। মানুষের মনে স্থাপন করেন ঐক্য ও আত্মবিশ্বাস। 


৬) কলকাতা মেডিকেল কলেজের সূচনা সম্পর্কে যা জানো লেখো।   ৪ 

উত্তর: 

ভূমিকা:- ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। কলকাতা মেডিকেল কলেজ ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যাচর্চার প্রতিষ্ঠান। ভারতে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেও আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যাচর্চার প্রসার ঘটেনি, কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এর সূচনা হয়। 

শিক্ষা বিষয়ক কমিটি:- ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড বেন্টিঙ্ক একটি শিক্ষা বিষয়ক কমিটি গঠন করেন; এর সভাপতি ছিলেন গ্র্যান্ট। ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে এই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে ভারতবর্ষে আধুনিক চিকিৎসা বিদ্যাচর্চার প্রয়োজন এবং তার সূচনা করবার কথা জানান। 

কলেজ প্রতিষ্ঠা:- ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন ড: জোসেফ ব্রামলি‌। কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় জমি দান করেন মতিলাল সেন। আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষিত চিকিৎসক ও সেবক-সেবিকা গড়ে তোলায় হয়ে ওঠে এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য।  

উল্লেখযোগ্য ছাত্র:- কলকাতা মেডিকেল কলেজের প্রথম ছাত্ররা ছিলেন দ্বারকানাথ গুপ্ত, রাজকৃষ্ণ দে প্রমুখরা। প্রথম মহিলা ছাত্রী ছিলেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। মধুসূদন গুপ্ত ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজের শব ব্যবচ্ছেদ করেন ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে। 


৭) উনিশ শতকে বাংলার সমাজ সংস্কারে ব্রাহ্মসমাজের উদ্যোগ আলোচনা করো।   ৮ 

উত্তর: 

ভূমিকা:- ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠার মূলে ছিল দুটি উদ্দেশ্য; যেমন প্রথমত, একদিকে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারকরা তাদের প্রকট হিন্দুধর্ম ও সমাজ জীবনে বিপর্যয় নিয়ে এসেছিল এবং দ্বিতীয়ত, তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের কুসংস্কার ও কুপ্রথাগুলি এমনভাবে সমাজে বিপর্যয় নিয়ে আসে যে, সেগুলিকে দূর করতে না পারলে হিন্দুধর্ম ও সমাজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে না -- এইরূপ পরিস্থিতিতে ব্রাহ্মসমাজের উদ্ভব ঘটে। 

রামমোহন রায়:- রামমোহন বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে একেশ্বরবাদই হল সকল ধর্মের মূল কথা। রামমোহন উপনিষদকে ভিত্তি করে ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে একটি ব্রাহ্ম সভা প্রতিষ্ঠা করেন যা পরবর্তীকালে 'ব্রাহ্মসমাজ' নাম ধারণ করে। এই ব্রাহ্মসমাজের উদ্দেশ্য ছিল পৌত্তলিকতাবাদ বর্জন করে নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করা। রামমোহনের সংস্কারমুক্ত যুক্তিবাদী মন হিন্দু সমাজে প্রচলিত বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কন্যাপণ, কৌলিন্য প্রথা, জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন প্রভৃতি বহুবিধ ও সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। এগুলি নিবারণের জন্য তিনি সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দ থেকেই নিজ জীবন তুচ্ছ করে তিনি সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন এবং জনমত গঠনে ব্রতী হন। হিন্দু শাস্ত্র ও বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে তিনি প্রমাণ করেন যে, সতীদাহ ধর্মবিরুদ্ধ ও অশাস্ত্রীয়। তাঁর আন্দোলনের প্রভাবে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে সতীদাহ প্রথা নিবারণ করে এক আইন পাস করে। কেবলমাত্র প্রচলিত এই কুপ্রথার হাত থেকে নারীর জীবন রক্ষায় নয়, মর্যাদা সহকারে তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টাও তিনি করেন। তিনি নারী-পুরুষ সমান অধিকারের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। বিধবার পুনর্বিবাহ নিয়ে তিনি চিন্তা করেন, স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারের কাজেও তিনি মন দেন। হিন্দু নারীর দায় অধিকার সম্পর্কে তিনিই প্রথম মতামত ব্যক্ত করেন। 

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর:- ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে রামমোহনের মৃত্যুর পর ব্রাহ্ম সমাজের আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে, এরপর মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মসমাজের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে দেবেন্দ্রনাথ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে গড়ে তোলেন 'তত্ত্ববোধিনী সভা'। এই প্রতিষ্ঠান দল-মত নির্বিশেষে সকল বাঙালি বুদ্ধিজীবীর মিলন কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং এর উদ্দেশ্য ছিল সংস্কারমুক্ত ধর্ম আলোচনা। এই সময় ব্রাহ্মসমাজ শিক্ষাবিস্তার, বিধবাবিবাহ, বাল্যবিবাহ প্রচলন, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিবারণ প্রভৃতি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আলোড়ন তোলে। তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপাত্র 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা' তৎকালীন সামাজিক কুসংস্কার ও কুপ্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। ব্রাহ্ম সমাজের আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে যুবকদের শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে তিনি খ্রিস্টাব্দে তত্ত্ববোধিনী পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করেন অক্ষয় কুমার দত্ত এই প্রতিষ্ঠান শিক্ষক নিযুক্ত হন। 

কেশবচন্দ্র সেন:- কেশবচন্দ্র সেন ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মসমাজের যোগ দেন। তিনি ব্রাহ্ম আন্দোলনকে প্রতিষ্ঠা করেন সামাজিক আদর্শ ও ধর্ম বিশ্বাসের ওপর। তিনি ছিলেন পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদ প্রথার বিরোধী। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে নীতিগত কারণে তিনি ও তাঁর অনুগামীরা আদি ব্রাহ্মসমাজ থেকে বহিস্কৃত হয়ে প্রতিষ্ঠা করেন 'ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ'। কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ব্রাহ্মসমাজ বিধবা বিবাহ, স্ত্রী শিক্ষা, অসবর্ণ বিবাহ, সুলভ সাহিত্য প্রচার, নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, শিক্ষাবিস্তার, পতিতা মেয়েদের উদ্ধার ও নানা জনহিতকর কার্যাবলীর পক্ষে এবং বাল্যবিবাহ, মদ্যপান ও পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। মূলত ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলনের ফলেই ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে সরকার বিখ্যাত 'তিন আইন' পাস করেন এবং তার দ্বারা বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ হয় এবং বিধবা বিবাহ ও অসবর্ণ বিবাহ আইন সিদ্ধ হয়। সেইদিন কেশবচন্দ্র সেনকে যেসব তরুণ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- শিবনাথ শাস্ত্রী, রামকুমার বিদ্যারত্ন, তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহেন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ। পরবর্তীতে কেশবচন্দ্র সেনের সাথে শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু  প্রমুখ নবীন ব্রাহ্ম নেতাদের বিরোধ দেখা দিলে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে তারা প্রতিষ্ঠা করেন 'সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ' এবং এরপর ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্র সেন প্রতিষ্ঠা করেন 'নববিধান' নামে একটি সংঘ। 

উপসংহার:- ভারতের নবজাগরণের ইতিহাসের ব্রাহ্ম সমাজের অবদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাহ্মসমাজ উনিশ শতকে ধর্মীয় মনোভাব, স্বাধীনতা, জাতীয়তাবোধ প্রভৃতি প্রচার করে সামাজিক ও জাতীয় অগ্রগতিতে বিশেষ সহায়ক হয়ে উঠেছিল। 


১) ভারতে ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে খ্রিস্টান মিশনারীদের অবদান কী ছিল?  ২ 

উত্তর:-  খ্রিস্টান মিশনারীরা ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের উপর জোর দিয়েছিলেন, ভারতের নানা অঞ্চলে তারা প্রচুর বিদ্যালয় স্থাপন করেন। জর্জ মার্শম্যান, ওয়ার্ড এবং উইলিয়াম কেরি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন ব্যাপটিস্ট মিশন। তাঁরা ১২৬ টি বিদ্যালয় স্থাপন করেন; এইসব বিদ্যালয়ে প্রায় ১০ হাজার ছাত্র পড়ার সুযোগ পায়।   

২) মেকলে মিনিটস বলতে কী বোঝায়? ২

উত্তর:-  পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষে সমর্থন জানিয়ে শিক্ষা বিভাগের প্রধান এবং উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আইন সচিব টমাস ব্যাবিংটন মেকলে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে ৭ ই মার্চ যে প্রস্তাব বা প্রতিবেদন পেশ করেন, তাকে 'মেকলে মিনিট' বা 'মেকলে প্রস্তাব' বলা হয়। 

৩) ক্রমনিম্ন পরিস্রুত নীতি কী?  ২ 

উত্তর:-  পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে মেকলের লক্ষ্য ছিল যে, যদি উচ্চ ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার ঘটানো যায় তাহলে ধীরে ধীরে তা সাধারণ বা নিম্নবিত্তদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। এই নীতি 'ক্রমনিম্ন পরিস্রুত নীতি' নামে পরিচিত। 

৪) ভারতে কোন নির্দেশনামাকে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে 'ম্যাগনাকার্টা' বলা হয়?   ২ 

উত্তর:-  বোর্ড অফ কন্ট্রোল এর সভাপতি চার্লস উড শিক্ষাসংক্রান্ত নির্দেশনামাকে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে 'ম্যাগনাকার্টা' বলা হয়। ভারতে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা এই নির্দেশনামার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। 

৫) হাজী মুহাম্মদ মহসীনের শিক্ষাচিন্তা বিষয়ে উল্লেখ করো।  ২ 

উত্তর:-  মুসলমান সম্প্রদায় যাতে শিক্ষিত হয়ে উঠতে পারে সেদিকে মোঃ হাজী মহসিন দৃষ্টি দিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। মাদ্রাসা শিক্ষার ব্যাপারে তিনি বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। 

৬) লালন ফকিরের ধর্মচিন্তা সম্পর্কে উল্লেখ করো।  ২ 

উত্তর:-  লালন ফকির ছিলেন বাংলার আধ্যাত্মিক বাউল সাধক, তিনি ধর্ম সম্পর্কে ছিলেন উদার। তিনি দীর্ঘকাল নবদ্বীপে থেকে শাস্ত্র চর্চা করেছিলেন। সহজ-সরল গানের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর জীবনের আদর্শ এবং সর্বধর্ম সমন্বয়ের ধারা বহন করেন। তাঁর নিজের জীবনে হিন্দু-মুসলিম বিতর্ককে ঘিরে তিনি গান রচনা করেন-- "সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে....." 

৭) বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর পরিচয় দাও।  ২ 

উত্তর:-  উনিশ শতকের বাংলার একজন অন্যতম সাধক ও সংস্কারক ছিলেন বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, তাঁর জন্ম ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে। বিজয়কৃষ্ণের সঙ্গে ব্রাহ্মনেতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচয় ঘটলে বিজয়কৃষ্ণ তাঁর প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন এবং তিনি ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। কিছুকালের মধ্যেই তিনি ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং আচার্যের পদে অধিষ্ঠিত হন। 

৮) 'তিন আইন' দ্বারা কী কী স্বীকৃত হয়?  ২ 

উত্তর:-  তিন আইন পাশ হয় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে। এই আইন দ্বারা 'বহুবিবাহ' এবং 'বাল্যবিবাহ' নিষিদ্ধ করা হয়, পাশাপাশি 'অসবর্ণবিবাহ' স্বীকৃত হয়। 

৯) 'নব্য বেদান্তবাদ' বলতে কী বোঝো?  ২ 

উত্তর:-  'বেদান্ত' সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের নতুন থেকে তিনি যে ব্যাখ্যা দেন তা 'নব্য বেদান্তবাদ' নামে পরিচিত। 'নব্য বেদান্তবাদ' অনুসারে, মানব সেবাই হল ব্রহ্মের সেবা।

১০) উনিশ শতকে বাংলার 'নবজাগরণ' বলতে কী বোঝায়?  ২ 

উত্তর:-  উনিশ শতকের শুরু থেকেই বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারের ফলে সমাজ-সংস্কৃতি ও ধর্মের ওপর যে প্রভাব পড়ে তার দ্বারা বাঙালির ভাবজগত তথা, বৌদ্ধিক জগতে এক পরিবর্তন সূচিত হয়। এই প্রবর্তনই হলো উনিশ শতকে বাংলার 'নবজাগরণ'। 

১১) নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী কাদের বলা হত?  ২ 

উত্তর:-  ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগে হিন্দু কলেজের অধ্যাপক ডিরোজিওর নেতৃত্বে তাঁর অনুগামী একদল তরুণ বাংলায় সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে এক চরমপন্থী আন্দোলনের সূচনা করেন। ডিরোজিও এবং তাঁর অনুগামী তরুণদের নব্যবঙ্গ গোষ্ঠী বলা হত। ডিরোজিওর অনুগামীরা হলেন- কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, রামতনু লাহিড়ী, প্যারীচাঁদ মিত্র, রসিককৃষ্ণ মল্লিক প্রমুখ। 

১২) ডেভিড হেয়ার সম্পর্কে কী জানো?  ২ 

উত্তর:-  ডেভিড হেয়ার ছিলেন স্কটল্যান্ডের একজন ঘড়ি ব্যবসায়ী; তিনি ভারতবর্ষের আসেন ও এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের জন্য চেষ্টা করেন। তিনি হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা নেন। নিজে পটলডাঙা একাডেমী প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে 'হেয়ার স্কুল' নামে পরিচিত। 

১৩) কালীপ্রসন্ন সিংহের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের নাম লেখো।  ২ 

উত্তর:-  কালীপ্রসন্ন সিংহের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হল- (১) হুতোম প্যাঁচার নকশা (২) মালতীমাধব (৩) বাবু এবং (৪) মহাভারতের বঙ্গানুবাদ। 

১৪) দীনবন্ধু মিত্র রচিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম লেখো।  ২ 

উত্তর:-  দীনবন্ধু মিত্র রচিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল- (১) নীলদর্পণ (২) সধবার একাদশী (৩) নবীন তপস্বিনী (৪) বিয়ে পাগলা বুড়ো। 

১৫) কয়েকজন ব্রাহ্মণ নেতার নাম লেখো।  ২ 

উত্তর:-  ব্রাহ্মনেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-- রাজা রামমোহন রায়, কেশবচন্দ্র সেন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রমুখ। 

১৬) ব্রাহ্মসমাজের যে কোনো দুটি সমাজ সংস্কারমূলক কাজের উল্লেখ করো।  ২ 

উত্তর:-  ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারমূলক কাজ হলো-- (১) মদপান নিবারণ করা, (২) অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। 

১৭) স্বামী বিবেকানন্দ রচিত কয়েকটি গ্রন্থের নাম লেখো।  ২ 

উত্তর:-  স্বামী বিবেকানন্দ রচিত কয়েকটি গ্রন্থ হল-- 'কর্মযোগ', 'জ্ঞানযোগ', 'রাজযোগ', 'বর্তমান ভারত', 'পরিব্রাজক', 'ভাববার কথা', :প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য' ইত্যাদি। 

১৮) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত কয়েকটি উপন্যাসের নাম লেখো।  ২ 

উত্তর:-  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত কয়েকটি উপন্যাস-- 'কপালকুণ্ডলা', 'দুর্গেশনন্দিনী', 'দেবী চৌধুরানী', 'আনন্দমঠ', 'রাজসিংহ', 'সীতারাম', 'বিষবৃক্ষ', 'কৃষ্ণকান্তের উইল' প্রভৃতি। 

১৯) 'পাশ্চাত্যবাদী' বলতে কাদেরকে বোঝানো হয়?  ২ 

উত্তর:-  ব্রিটিশ নিয়োজিত জনশিক্ষা কমিটির সদস্য- মেকলে, আলেকজান্ডার ডাফ, কোলভিন, সন্ডার্স প্রমুখরা ভারতবর্ষে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই এরা 'পাশ্চাত্যবাদী' নামে পরিচিত। 

২০) 'প্রাচ্যবাদী' বলতে কাদেরকে বোঝানো হয়?  ২ 

উত্তর:-  ভারতবর্ষে জনশিক্ষা বিষয়ে ব্রিটিশ নিয়োজিত কমিটির সদস্য- প্রিন্সেপ, উইলিয়াম প্রমুখরা ছিলেন প্রাচ্যশিক্ষা প্রসারের সমর্থক, তাই এদের 'প্রাচ্যবাদী' বলা হয়। 




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন