মঙ্গলবার, ৩০ মার্চ, ২০২১

একাদশ বাংলা - সাহিত্যের ইতিহাস

 ১) মঙ্গলকাব্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।   ৫ 

উত্তর:  প্রতিটি মঙ্গলকাব্য দেবখণ্ড ও নরখন্ড -- এই দুই আখ্যান ভাগে বিভক্ত। দেবখন্ডের বিষয়বস্তু হল- কোন দেব বা দেবীর পূজা প্রচারের উদ্দেশ্যে কোন দেবকন্যা বা দেবপুত্রকে ছলে-বলে-কৌশলে বা অভিশাপ দিয়ে মর্তে পাঠানো হয়। নরখন্ডের বিষয়বস্তু হলো- ওইসব শাপগ্রস্ত মানবরূপী দেবকন্যা বা পুত্রদের  দ্বারা মর্তে দেবতার পূজার প্রচলন করা এবং তারপরে তাদের আবার স্বর্গে ফিরে যাওয়া। 

    উপরের এই গঠন বৈশিষ্ট্য ছাড়াও মঙ্গলকাব্য গুলির বেশ কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়-- 

(ক) দেবদেবীর বন্দনা: প্রতিটি মঙ্গলকাব্যেরই শুরুতে থাকে দেবদেবীর বন্দনাসহ কবির পিতা-মাতা ও গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। 

(খ) গ্রন্থ রচনার কারণ: প্রায় প্রতিটি মঙ্গলকাব্যের কবি কাব্যরচনার কারণ হিসেবে দেবদেবীর স্বপ্নাদেশের কথা বলেছেন। 

(গ) বারোমাসী বা বারোমাস্যা: নায়িকার বারো মাসের দুঃখের বর্ণনা এতে স্থান পায়। যেমন ফুল্লরার বারোমাস্যা। 

(ঘ) নারীদের পতিনিন্দা: বিবাহ সভায় নারীরা নায়কের সঙ্গে নিজ নিজ পতিদের তুলনা প্রসঙ্গে যা বলতেন তাই এই অংশে বর্ণিত হয়েছে। যেমন- "মহাকবি মোর পতি কত রস জানে / কহিলে সরস কথা বিরস বাখানে।" 

(ঙ) রন্ধনপ্রণালী: বাঙালি যে ভোজন প্রিয় স্বভাবের তার বিভিন্ন বর্ণনা মঙ্গলকাব্যে লক্ষ্য করা যায়। যেমন- শিবের পার্বতীর প্রতি রন্ধনের নির্দেশ-  "আজি গনেশের মাতা রান্ধ মোর মতো / নিমে শিমে বেগুন দিবে তাতে দিবে তিত।"  


২) বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাপতি অন্তর্ভুক্তির কারণ আলোচনা করো।  ৫ 

উত্তর:  চৈতন্য পূর্ববর্তী বাংলা বৈষ্ণব সাহিত্যে বিদ্যাপতি একটি প্রধান প্রতিষ্ঠান। জয়দেব সংস্কৃত ভাষায় রাধাকৃষ্ণ প্রেম বিষয়ক যে পদাবলী সাহিত্যের সূচনা করেছিলেন মিথিলার কবি 'মৈথিলী কোকিল' বিদ্যাপতি 'অভিনব জয়দেব' নামগ্রহণ করে সেই পদাবলী সাহিত্যের পূর্ণতা দান করেছিলেন। রাধাকৃষ্ণ প্রেম বিষয়ক কাব্যকথা ও তাঁর প্রকাশভঙ্গির চমৎকারিত্বের জোরে বাঙালির জীবন সর্বস্বরূপে তিনি জয়দেব চন্ডীদাসের নামের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হন। 

   বিদ্যাপতি চতুর্দশ শতকের শেষভাগে মিথিলার মধুবনী পরগনার বিসফী গ্রামে প্রসিদ্ধ শৈব ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। বিদ্যাপতি বাংলা ভাষায় একছত্রও কাব্য কবিতা লেখেননি, তা সত্ত্বেও তিনি বাংলা সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাঁর এই অন্তর্ভুক্তির কারণগুলি হল-- 

(ক) বাংলা ও মিথিলা এই দুটি সন্নিহিত অঞ্চলের মধ্যে শিক্ষা-সংস্কৃতি, সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভৃতি দিক থেকে ঘনিষ্ঠতা ছিল। তৎকালে ন্যায়শাস্ত্রের পড়ুয়া ছাত্ররা অধ্যায়নের জন্য মিথিলায় যেত এবং বিদ‍্যা সমাপন করে মিথিলার কবি বিদ্যাপতির রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলী গান কন্ঠে নিয়ে ফিরত। আর এই সূত্র ধরেই বিদ্যাপতি বাঙালির আপনজন হয়ে উঠেছেন। 

(খ) 'ক্ষণদাগীতচিন্তামণি', 'পদামৃতসমুদ্র', 'পদকল্পতরু' প্রভৃতি পুরানো বৈষ্ণবপদ সংকলন গ্রন্থে বিদ্যাপতির পদ স্থান পাওয়ায় এবং 'চৈতন্যচরিতামৃত' -এ বিদ্যাপতির উল্লেখ থাকায় বাঙালিরা বিদ্যাপতিকে বাঙালি কবি হিসেবে মেনে এসেছেন।  

(গ) বিদ্যাপতির পদে বৈষ্ণব ধর্মের কোন প্রভাব না থাকা সত্ত্বেও মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব কর্তৃক তা সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি লাভ করেছিল। যেমন-- "বিদ্যাপতি জয়দেব চন্ডীদাসের গীত। / আস্বাদয়ে রামানন্দ স্বরূপ সহিত।" বাংলা সমাজ ও সাহিত্যে চৈতন্যদেবের ব্যাপক প্রভাব থাকায় চৈতন্যদেব কর্তৃক বিদ্যাপতির পদ আস্বাদনের সূত্রে বৈষ্ণব সমাজ তথা বাঙালি পাঠকের কাছে বিদ্যাপতি আদর্শ পদকর্তা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন।

(ঘ) রাধাকৃষ্ণ প্রেমকে বিদ্যাপতি কাব্যবিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন বলেই তিনি সহজে বাংলা সাহিত্যে ঢুকে পড়েছেন। কারণ, এই রাধাকৃষ্ণ প্রেম বাঙালির মন ও মননকে নিত্য-নৈমিত্তিক ছুঁয়ে যায়, বাঙালির মনের মাধুরীকে দোলা দেয়। 

(ঙ) বিদ্যাপতি যে ব্রজবুলি ভাষায় পদ রচনা করেছিলেন সেই ভাষাযর রচনা মাধুর্যে আকৃষ্ট হয়ে রায়শেখর, গোবিন্দদাস এমনকি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত পদ রচনা করেছিলেন। যেমন- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, "মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সমান" 

    বস্তুত, বিদ্যাপতি বাঙালি না হলেও বাঙালির মনে-মজ্জায় প্রতিষ্ঠিত আছেন। আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন তাই যথার্থভাবেই মন্তব্য করেছেন-- "বিদ্যাপতিকে বাদ দিলে বাংলা সাহিত্য খোঁড়া হয়ে যায়।" 


৩) বাংলা সমাজ ও সাহিত্যে শ্রীচৈতন্যদেবের অবদান আলোচনা করো।   ৫ 

উত্তর:  চৈতন্যদেব মধ্যযুগের বাংলা সমাজ ও সাহিত্যের একজন যুগন্ধর পুরুষ। তিনি ছিলেন মানবতাবাদের মূর্ত বিগ্রহ। বাংলার সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর প্রভাব বিদ্যমান শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের ফলে বাংলাদেশ যে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল তা 'চৈতন্য রেনেসাঁ' নামে বিশেষভাবে পরিচিত। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান হল-- 

(ক) বর্ণ বৈষম্য বিভাজিত হিন্দু সমাজ ব্যবস্থায় চৈতন্যদেব তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম সাধনার মাধ্যমে বর্ণাশ্রমের সকল বাধাকে লুপ্ত করে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর ধর্ম সাধনার মূলবাণী স্বরূপ "চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠঃ হরি ভক্তিপরায়ণঃ" কিংবা "যে জন কৃষ্ণ ভজে সে মোর প্রাণের ঠাকুর" প্রভৃতি যেসব কথা বলেছিলেন তাতে একটি সমাজ সংস্কারমূলক বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছিল। 

(খ) বাংলা সাহিত্যে চৈতন্য প্রভাবের কালকে অনেকে ঐশ্বর্যকাল বলে চিহ্নিত করেছেন, অথচ চৈতন্যদেব বাংলা ভাষায় একটি পংক্তিও রচনা করেছেন বলে জানা যায় না। কেবল তাঁর মুখনিসৃত আটটি শ্লোকবদ্ধ উপদেশ ছাড়া। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে চৈতন্যদেব বাংলা সাহিত্যে ঐশ্বর্য দান করে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন। 

(গ) চৈতন্য আবির্ভাবের ফলে পদাবলী সাহিত্য রচনায আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। শ্রীচৈতন্যদেব ছিলেন-- " রাধাভাবদ‍্যুতি সুবলিততনু কৃষ্ণস্বরূপম"‌। চৈতন্যের এইরূপকে অবলম্বন করে রচিত হল গৌরচন্দ্রিকা ও গৌরাঙ্গবিষয়ক পদ, ফলে পদাবলী সাহিত্যের বিষয়বস্তুগত বৈচিত্র‍্য সাধিত হল। 

(ঘ) বাংলা সাহিত্যে চৈতন্যজীবনী গ্রন্থগুলিকেই আদি জীবনী কাব্যের মর্যাদা দেওয়া হয়। যদিও এগুলি প্রকৃত অর্থে বায়োগ্রফি নয়, হ‍্যাজিওগ্রাফি। বৃন্দাবন দাসের 'চৈতন্যভাগবত', লোচন দাস ও জয়ানন্দের 'চৈতন্যমঙ্গল', কৃষ্ণদাস কবিরাজের 'চৈতন্যচরিতামৃত' প্রভৃতি চৈতন্যজীবনী গ্রন্থগুলি চৈতন্যজীবন ও তথ্য নিয়ে রচিত হয়েছে। 

(ঙ) বাংলা সঙ্গীতের জগতে বৈষ্ণবকীর্তন একটা বৈপ্লবিক সংযোজন। শ্রী চৈতন্যদেবের প্রভাবের ফলেই নগরকীর্তন ও পালাকীর্তনের নতুন সুর  সংযোজিত হয়। 

   সামগ্রিকভাবে চৈতন্য প্রভাব বাঙালির সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম ও সাহিত্যে এমন গভীর ও ব্যাপক পরিমণ্ডল তৈরি করেছিল যার অনুরণ মধ্যযুগ অতিক্রম করে আধুনিক যুগেও প্রবেশ করেছে। সমালোচক দীনেশচন্দ্র সেন বলেছিলেন, " প্রেম পৃথিবীকে একবার মাত্র রূপ গ্রহণ করিয়াছিল, তাহা বাংলাদেশে।" 


৪) রামপ্রসাদ সেনের কবি প্রতিভার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।   ৫ 

উত্তর:  মাতৃসাধক ও ভক্ত কবি রামপ্রসাদ সেন শাক্ত গীতিকারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করেছেন। এই শ্রেষ্ঠত্বের কারণ- তাঁর পদে আধ্যাত্মিকতা ও জীবনরসের এক সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটেছে এবং তার প্রকাশ হয়েছে সহজ, স্বচ্ছ ও সাবলীল। সেজন্যই সমালোচকদের সঠিক মন্তব্য-- "বৈষ্ণব সাহিত্যে চন্ডীদাসের যে আসন, শাক্ত সঙ্গীত সাহিত্যে রামপ্রসাদেরও ঠিক সেই আসন।" 

কবিপ্রতিভা: ১৭২০ খ্রীষ্টাব্দে উত্তর 24 পরগনার হালিশহরের নিকটবর্তী কুমারহট্ট গ্রামে কবি রামপ্রসাদ সেনের জন্ম। রামপ্রসাদ মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। রামপ্রসাদ 'বিদ্যাসুন্দর', 'কালীকীর্তন' ও 'কৃষ্ণকীর্তন' প্রভৃতি কাহিনী কাব্য রচনা করলেও তাঁর যথার্থ পরিচয় শাক্ত পদকার হিসেবেই।  

   তাঁর সম্বন্ধে নানান অলৌকিক গল্প প্রচলিত রয়েছে। স্বয়ং দেবী কালিকা কবির কন্যা সেজে বেড়া বাঁধতে কবিকে সাহায্য করেছিলেন। দেবী অন্নপূর্ণা তাঁর গান শোনার জন্য কাশী ছেড়ে কবির চণ্ডীমণ্ডপে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি বিশিষ্ট গায়ক ছিলেন, তাঁর সাদামাটা সুর 'প্রসাদী' সুর নামে খ্যাত।

   রামপ্রসাদ জীবনপ্রেমিক অথচ উদাসীন, তিনি গৃহী অথচ ত্যাগী, তিনি ভোগী অথচ যোগী। তান্ত্রিক সাধনার এই বিচিত্র সমন্বয়ের মর্মবাণীই তাঁর কবিতার মর্মবাণী। উমা সংগীত এবং শ্যামাসংগীত উভয় প্রকার গানেই তিনি সিদ্ধহস্ত। তবু তাঁর শ্যামাসঙ্গীতগুলি মানুষকে বেশি টানে। যেমন-- "মা আমায় ঘুরাবে কত, / কলুর চোখ-ঢাকা বলদের মতো?" কিংবা "মন রে কৃষিকাজ জানো না / এমন মানব জমিন রইল পতিত, / আবাদ করলে ফলতো সোনা।" 

   কিংবা মা হয়ে সন্তানকে প্রবঞ্চনা করেন বলেই রামপ্রসাদের অনুযোগ মেশানো সন্তানের অভিমান-- "মা, নিম খাওয়ালে চিনি বলে কথায় করে ছলো / ওমা, মিঠার লোভে তিত মুখে সারাদিনটা গেল।" 

   'বিজয়া'র পদেও কমলাকান্ত অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, আনন্দের পরেই আসে বিষাদ, নবমী নিশি শুরু হতেই মাতৃহৃদয় বিরহবেদনা পূর্ণ হয়ে যায়। সমাসোক্তি অলংকারের মাধ্যমে এই মাতৃহৃদয়ের বেদনাকে কমলাকান্ত চিত্রিত করেছেন এইভাবে, " ওরে নবমী নিশি না হইও রে অবসান / শুনেছি দারুন তুমি না রাখো সতের মান।" 

     তাই, রামপ্রসাদের গানের সুরের আবেদন গৃহস্থের মনেও সাড়া জাগায়। শাক্ত পদাবলীর শ্রেষ্ঠ কবি রামপ্রসাদের 'রামপ্রসাদী সংগীত' বাংলা সাহিত্যে এক অমূল্য সম্পদ। 


৫) বাংলার বৈষ্ণব পদসাহিত্যে চন্ডীদাস এর অবদান আলোচনা করো।   ৫ 

উত্তর:  বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একাধিক চন্ডীদাসের অস্তিত্ব নিয়ে বহু তর্ক বিতর্ক থাকলেও চৈতন্য পূর্ববর্তী যুগে যে একজন চন্ডীদাস ছিলেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। 

   চন্ডীদাসের রাধা কৃষ্ণ প্রেম সম্পর্কে ধারণা প্রথম থেকেই স্পষ্ট। প্রেমে মিলনের আনন্দ অপেক্ষা বিরহের যন্ত্রনা যে একমাত্র প্রাপ্য তাও তার জানা। চন্ডীদাসের রাধা ভালোভাবেই জানে প্রেমের জন্য যন্ত্রণা ভোগ করতে না পারলে তার প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা যায় না। কবির ভাষায়-- "সুখের লাগিয়া / যে করে পিরিতি, / দুঃখ যায় তার ঠাঞি।" চন্ডীদাসের রাধা কৃষ্ণ মিলনের গভীরতার মধ্যেও "দুহু করে দুহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া / আজ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।" 

    চন্ডীদাসের কাব্যের একটি মূল সুর মানবপ্রীতি ও মর্ত‍্যপ্রীতি। তাঁর সেই বহুবিশ্রুত পদটি - "শুনহ মানুষ ভাই, / সবার উপরে মানুষ সত্য, / তাহার উপরে নাই।" 

     চণ্ডীদাসের পদাবলীর মূল বিশেষত্বগুলি হল-- 

(ক) চন্ডীদাস সহজ-সরল কথায় গভীরতম প্রাণ-বেদনার রূপকার ছিলেন। পদকর্তা চন্ডীদাস প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, "আমাদের চন্ডীদাস সহজ ভাষার সহজ ভাবের কবি, এই গুণে তিনি বঙ্গীয় প্রাচীন কবিদের মধ্যে প্রধান কবি।" 

(খ) সহজ ছন্দে এবং স্বভাবোক্তি অলংকারের মধ্য দিয়েই তাঁর রচনা গভীরতম ভাবের উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে উঠেছে।

(গ) চন্ডীদাসের রাধা প্রথম থেকেই কৃষ্ণের জন্য আকুল। কৃষ্ণের কাছে তিনি সবকিছু সমর্পন করে বসে আছেন। দুঃখই তাঁর কৃষ্ণ প্রেমের অন্যতম পরিচয়,।সেজন্য চন্ডীদাসের রাধা চরিত্রে বৈচিত্র‍্য এবং ক্রমবিকাশ নেই বললেই চলে। 


৬) কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের কবি প্রতিভার পরিচয় দাও।   ৫ 

উত্তর:  শুধু মঙ্গলকাব্যের ধারায় নয় মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ধারায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কবিকঙ্কন। তাঁর কাব্য 'চন্ডীমঙ্গল' নামে প্রচলিত হলেও আসলে এই কাব্যের নাম 'অভয়ামঙ্গল'। মুকুন্দরাম নামটি প্রচলিত থাকলেও তাঁর আসল নাম মুকুন্দ এবং উপাধি 'কবিকঙ্কন'। কবি প্রতিভার বিশেষ দিকগুলি-- 

(ক) কবি নিখুঁতভাবে বাস্তবকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তার প্রকাশ করেছেন উপযুক্ত ক্ষেত্রে। ফুল্লরা, মুরারী শীল, ভাড়ুদত্ত, দূর্ব লা দাসীপ্রভৃতি চরিত্র তাঁর কাব্যে জীবন্ত রূপলাভ করেছে। কৌতুক রস সৃষ্টিতেও মুকুন্দরাম যথেষ্ট পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। 

(খ) মঙ্গলকাব্যের অন্যান্য কবিদের মতো গতানুগতিক ভাবে মুকুন্দ চক্রবর্তী ঘটনা বিবৃত করেননি। উপস্থাপনা ও ঘটনার বর্ণনায় তিনি অভিনবত্বের পরিচয় দিয়েছেন। 

(গ) আধুনিক জীবন দ্বন্দ্ব-সংঘাতময়। কবি মুকুন্দের কাব্যেও আধুনিক জীবনসুলভ নাটকীয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত, উৎকণ্ঠা ও কৌতুহলের প্রয়োগ লক্ষণীয়। ছদ্মবেশিনী দেবীকে ঘিরে ফুল্লরা ও কালকেতুর মনে যে ঘাত-প্রতিঘাত সৃষ্টি হয়েছে, তাতে রয়েছে অভিনবত্ব। 

(ঘ) মুকুন্দের কাব্যে সামাজিক সমস্যা জীবন্ত রূপে চিত্রিত হয়েছে। যেমন-- সতীন সমস্যা মধ্যযুগের এক বিশেষ সামাজিক সমস্যা যা চিত্রিত হয়েছে এইভাবে- " শাশুড়ি ননদি নাহি নাহি তোর সতা / কার সঙ্গে দ্বন্দ্ব করি চক্ষু কৈলি রাতা।" 

(ঙ) মুকুন্দ চক্রবর্তী কাব্যের ভাষা ছন্দ ও অলংকারের প্রতি একেবারেই উদাসীন থাকেননি। উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা, সমোসক্তি প্রভৃতি অলংকার তাঁর 'চন্ডীমঙ্গল' কাব্যে রয়েছে। প্রচলিত প্রবাদকেও তিনি সার্থকভাবে তাঁর কাব্য ভাষায় প্রয়োগ করেছেন। 



  

    

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মাধ্যমিক বাংলা, অধ্যায়ভিত্তিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

  জ্ঞানচক্ষু  ১) "রত্নের মূল্য জহুরির কাছে" - 'রত্ন' ও 'জহুরী' কে? জহুরি রত্নের মূল্যায়ন কেমনভাবে করেছিলেন? ৩  ২)...