১) "আমি কি তা দেখতে পাচ্ছিস নে?" - কোন্ প্রশ্নের উত্তরে বক্তা একথা বলেছেন? গল্প অনুসারে বক্তার স্বরূপ উদঘাটন করো। ১+৪
উত্তর:- সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পে এক থুত্থুড়ে বুড়ির মৃতকল্প দেহের দখল নিয়ে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বিবাদোন্মুখ হয়ে ওঠে। বিবাদ যখন রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের রূপ নিতে চলেছে, তখন হঠাৎ বুড়ি নড়েচড়ে উঠে বসলে, তাকে জীবিত দেখে প্রথমে চৌকিদার, পরে দু'দিকের জনতা হতবাক হয়ে প্রশ্ন করে- "বুড়ি, তুমি হিন্দু না মুসলমান?" - এই প্রশ্নের উত্তরেই বুড়ি শ্লেষের সঙ্গে প্রশ্নে প্রদত্ত কথাগুলি বলে।
•• গল্পে যে থুত্থুড়ে রাক্ষসী চেহারার বৃদ্ধাকে লেখক উপস্থাপিত করেছেন, তার নাম সম্প্রদায় জাতধর্মের কোনো প্রসঙ্গ তিনি আনেননি। কিন্তু গল্পে তিনি আবহমান ভারতের পরস্পর বিবাদমান ধর্মসম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমানকে জোরালোভাবে উপস্থিত করেছেন। বৃদ্ধাকে একদিন সকালে নিঃসাড় অবস্থায় কিছু মানুষ এক বটগাছের কর্দমাক্ত খোঁদলে আবিষ্কার করে। ধরে নেয় সে মারা গেছে। সরকারি আইন রক্ষক চৌকিদারের পরামর্শ হিন্দুরা তাকে বাঁশের চ্যাংদোলায় নিয়ে ফেলে আসে নদীর চড়ায়। বিকেলে মুসলমানরা ওই চ্যাংদোলায় করে তাকে তুলে আনে বাজারে। গায়ের মোল্লাসাহেব ও ভটচাজমশায়ের ক্রমাগত উস্কানিতে মৃতদেহ নিয়ে সাম্প্রদায়িক বিবাদ শুরু হয়। ঘটনা যখন চরমে পৌঁছায় তখন বুড়ি নড়েচড়ে উঠে বসে। প্রমাণিত হয় সে মরেনি।
বৃদ্ধার মুখের ব্যঙ্গমিশ্রিত ও জিজ্ঞাসাসূচক কথাগুলি আসলে লেখকের। তিনি বলতে চেয়েছেন, মানুষ মানুষই। সম্প্রদায় বা ধর্মগত পরিচয় তার ততটা মূল্যবান নয়। মানবিকতাই মানুষের আসল ধর্ম, তাই মানুষ পরিচয়টিকে জীবনের প্রধান মূল্য দেওয়া উচিত। এ পরিচয় একবার মনে ঠাঁই পেলে মানুষ পূর্ণ হয়ে জেগে ওঠে।
২) "শেষ রোদের আলোয় সে দূরের দিকে ক্রমশ আবছা হয়ে গেল।" - কার কথা বলা হয়েছে? সে ক্রমশ আবছা হয়ে গেল কেন? ১+৪
উত্তর:- কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের 'ভারতবর্ষ' গল্পে শেষ রোদের আলোয় যার দূরের দিকে ক্রমশ আবছা হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, সে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তথা নাম-গোত্রহীন এক থুত্থুরে বুড়ি।
•• গল্পের কাহিনী বিন্যাসে দেখি রাঢ়বঙ্গের দুঃসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে এক থুত্থুরে বুড়ি বাজার এলাকায় প্রবেশ করে। তারপর 'ফাঁপি'র প্রবল শৈত্য ও ভেজা প্রকৃতিতে বটগাছের খোঁদলে রাত্রিযাপন করে। পরদিন সকালে সেখানে বুড়িকে দেখে লোকজন অনুমান করে নেয় যে সে মৃতা। এই কল্পমৃত্যুর পটভূমিতেই লেখক আনয়ন করেন ভারতের পারস্পরিক ধর্মদ্বন্দ্বের ঘটনাক্রম, যেখানে সামান্য ছুঁতো পেলেই প্রাতিষ্ঠানিক দুই ধর্মের মানুষ হিন্দু-মুসলমান একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে, দ্বন্দ্বযুদ্ধে মেতে ওঠে। এখানেও একই ব্যাপারের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা যায়। দ্বন্দ যখন চরমে পৌঁছেছে তখনই লেখক বুড়িকে পুনর্জাগরিত করেন। শুধু তাই নয়, ধর্মতন্ত্রের দুই লড়াকু সম্প্রদায়ের মানুষজনদের কৌতুহলী জিজ্ঞাসার উপর নির্ভীক ও উপেক্ষাময় পদসঞ্চারে বুড়ির চলে যাওয়া দেখান। বোঝা যায়, প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি অবজ্ঞা ছুঁড়ে দিয়েছেন লেখক। ধর্ম হল, যা ধারণ করা হয়। মানুষ মানবতা ধারণ করুক - এই লেখকের প্রত্যাশা। কিন্তু মানুষ মৃত মানুষের ধর্মপ্রমাণে লড়াই করে, সশস্ত্র হয়ে। তাই বুড়ির 'দূরের দিকে ক্রমশ আবছা' হয়ে যাওয়া যেন ধর্মের অমানবিক দিকটিকেই বাস্তবিক উপস্থাপিত করে।
৩) 'ভারতবর্ষ' গল্পের বুড়ি কীভাবে ভারতবর্ষের প্রতীক হয়ে উঠেছে তা বুঝিয়ে দাও। ৫
উত্তর:-
প্রতীকধর্মিতার স্বরূপ: প্রতীক হলো সাহিত্যে সংকেত দ্বারা ভাব প্রকাশের এক প্রকার পদ্ধতি বা রীতি। তাই অনেক সময়ই প্রতীকের সাহায্যে কবি ও সাহিত্যিক তাঁর বক্তব্যের ব্যঞ্জনাকে প্রকাশ করেন। প্রতীকের সাহায্যে একটি ঘটনা বা কোন বিষয়কে অবলম্বন করে একটি বাহ্যিক অর্থের আড়ালে লেখক একটি গভীর অর্থ নিহিত রাখেন। 'ভারতবর্ষ' গল্পটিতে প্রতীকের যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবহার হয়েছে।
গল্পে প্রতীকী বৃদ্ধা চরিত্র: গল্পের পটভূমিতে লেখক অত্যন্ত সযত্নে স্থাপন করেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আর সেই দুর্যোগে এক নাম-গোত্রহীন অতি বৃদ্ধা চরিত্রকে প্রতীক রূপে হাজির করেন। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, এই বৃদ্ধা লেখকের উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হিসেবে উপস্থিত।
বৃদ্ধা চরিত্রের ভূমিকা: লেখক উক্ত গল্পে আবহমানকালের চিরায়ত ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বের প্রতীকরূপে উপস্থিত করেছেন বৃদ্ধাকে। হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বে
জর্জরিত ভারতবর্ষ, যার অস্তিত্বের সংকট নিয়ে দেশীয় মানুষদের কোনো মাথাব্যথা নেই। সে যে জীবন্মৃতা আছে, এ নিয়েও মানুষের কোনো ইতিবাচক ভাবনা নেই। তাকে নিয়ে কেবল অধিকারের লড়াই আছে। হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে এই প্রতীকী মাত্রা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই গল্পের শেষে নড়ে বসা বুড়িকে বলতে শোনা যায়-
"আমি কী তা দেখতে পাচ্ছিস নে?"
সমগ্র গল্পজুড়ে লেখক বৃদ্ধার অনুষঙ্গে যে ধর্মীয় অন্ধত্বের বীজ বপন করেন তা গল্পের সমাপ্তিতে উপেক্ষাভরা একটি উত্তরে নির্মূল হয়। বুড়ির উত্তরে মানবিক পরিচয়ই প্রতীকী হয়ে ওঠে। তাই 'ভারতবর্ষ' গল্পটিকে একটি সার্থক প্রতীকধর্মী গল্প বলা যায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন