১) সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণগুলি আলোচনা করো। ৪
উত্তর:-
ভূমিকা: সাঁওতালরা ছিল শান্তিপ্রিয়, সরল প্রকৃতির এবং কঠোর পরিশ্রমী আদিবাসী সম্প্রদায়। উনিশ শতকের প্রথম দিকে তারা ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে বিতাড়িত হয়ে 'দামিন-ই-কোহ' নামে রাজমহল পাহাড়ের প্রান্তবর্তী সমতল অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে এবং আবাদযোগ্য জমি গড়ে তোলে, কিন্তু ঔপনিবেশিক অরণ্য আইন তাদের শান্তি ও পরিশ্রমের মূলে আঘাত করলে তারা বিদ্রোহ শুরু করে। সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণগুলি হল--
(১) অতিরিক্ত খাজনা: সাঁওতালরা প্রচুর পরিশ্রমের দ্বারা জঙ্গলাকীর্ণ পাথরে জমিকে চাষের উপযোগী করে তুলেছিল, তার ওপর দিনের পর দিন খাজনার হার বাড়িয়ে জমিদার ও মহাজনরা তা দখল করে নেয়; খাজনা দিতে না পেরে অনেক সময় জমিজমা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়।
(২) নগদ খাজনা আদায়: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা সাঁওতালদের কাছে ফসলের পরিবর্তে রাজস্ব নগদ টাকা আদায় করার রীতি চালু করলে এবং জমির ওপর উপশুল্ক চাপিয়ে দিলে তাদের অবস্থা সঙ্কটজনক হয়ে পড়ে।
(৩) ধর্মান্তরকরণ: খ্রিস্টান মিশনারীরা জোর করে সাঁওতালদের খৃষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা চালালে সাঁওতালদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
(৪) মর্যাদায় আঘাত: রেললাইন স্থাপনের কাজে ইউরোপীয় কর্মচারীরা সাঁওতালদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করত এবং মহিলাদের সম্মান নষ্ট করত।
উপসংহার: উনিশ শতকের প্রথমার্ধে সংঘটিত আদিবাসী বিদ্রোহগুলির মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক ও রক্তক্ষয়ী ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দে সিধু-কানু-চাঁদ-ভৈরব এর নেতৃত্বে সংঘটিত সাঁওতাল বিদ্রোহ।
২) মুন্ডা বিদ্রোহের কারণ গুলি আলোচনা করো। ৪
উত্তর:-
ভূমিকা: ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে ডিসেম্বর বীরসা মুন্ডার নেতৃত্বে অন্যতম উপজাতি সম্প্রদায় মুন্ডারা এক তীব্র বিদ্রোহ শুরু করে। এই বিদ্রোহের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল--
(১) ঐতিহ্যে আঘাত: মুন্ডারা যে সমস্ত অঞ্চলে বাস করত সেখানে তাদের প্রাচীন উপজাতি আইন ও প্রথা প্রচলিত ছিল, ব্রিটিশরা সেখানে পুরোনো আইন বাতিল করে নতুন শাসন ব্যবস্থা চালু করলে সেই ঐতিহ্য তাদের আঘাত লাগে।
(২) খুৎকাঠি প্রথা অবসান: মুন্ডারা খুৎকাঠি প্রথা অনুসারে যৌথভাবে জমির মালিকানা ভোগ করতো কিন্তু ব্রিটিশরা এর অবসান ঘটিয়ে জমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা বলবৎ করে।
(৩) অত্যধিক করের বোঝা: মুন্ডাদের ওপর বিভিন্ন রকম করের বোঝা ব্রিটিশ সরকার ও জমিদাররা চাপিয়ে দেয় এবং তা অনাদায়ে অত্যাচার চালায়।
(৪) শ্রমদানে বাধ্য করা: ব্রিটিশ সরকার ও দেশীয় জমিদারেরা মুন্ডাদের বিনা বেতনে বেগার শ্রমদানে বাধ্য করতো; আবার কখনো লোভ দেখিয়ে তাদের সাথে চুক্তির মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কাজে বহাল করত এবং তাদের উপর অত্যাচার করত।
উপসংহার: ভারতবর্ষে যে কোন উপজাতি সম্প্রদায়কে তৎকালীন খ্রিস্টান ধর্মযাজকরা নানা উপায়ে খৃষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করত, মুন্ডারা তার ব্যতিক্রম ছিল না। এর ফলে তাদের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিদ্রোহের কারণ হয়ে ওঠে।
৩) বারাসাত বিদ্রোহের গুরুত্ব আলোচনা করো। ৪
উত্তর:-
ভূমিকা: তিতুমীরের নেতৃত্বে বাংলার মুসলমান কৃষক সম্প্রদায় ব্রিটিশ সরকার ও দেশীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহ শুধুমাত্র কৃষক বিদ্রোহ ছিল না, এর এক ধর্মীয় চরিত্রও ছিল যথেষ্ট স্পষ্ট।
কৃষ্ণদেব রায়ের বিরোধিতা: জমিদার কৃষ্ণদেব রায় তিতুমীর ও তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে ফরমান জারি করলে তিতুমীরের অনুগামীদের সাথে জমিদার বাহিনীর সংঘর্ষ শুরু হয়। তিতুমীর জমিদারদের বিরুদ্ধে বিশেষত হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে তাঁর অনুগামীদের ঐক্যবদ্ধ করেন।
ব্রিটিশদের বিরোধিতা: দেশীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ শুরু হলেও যেহেতু দেশীয় জমিদাররা ব্রিটিশ সরকারের সহায়তা লাভ করত সেহেতু শেষ পর্যন্ত এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ বিরোধী হয়ে ওঠে।
কৃষক সংগ্রাম: বারাসাত বিদ্রোহ কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করতে সাহায্য করে। ওয়াহাবি আন্দোলনের ধর্মীয় রূপ এই আন্দোলনে স্পষ্ট ছিল; কারণ, মুসলমান কৃষক সম্প্রদায় ছিল এই আন্দোলনের মূল শক্তি। তিতুমীরের নেতৃত্বে দরিদ্র মুসলমান কৃষকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই সংগ্রামে অংশ নেয়। ড: বিনয় ভূষণ চৌধুরীর মতে, "এই বিদ্রোহ ধর্মীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত এক কৃষক বিদ্রোহ।"