*1. মৌসুমি বিস্ফোরণ কী?*
উত্তর: ভারতে গ্রীষ্মকালের শেষদিকে উত্তর পশ্চিমভাগে এক গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এর ফলে ভারতমহাসাগর থেকে আগত জলীয়বাষ্পপূর্ণ আর্দ্র দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। এই বায়ু আরবীয় ও বঙ্গোপসাগরীয় দুটি শাখায় বিভক্ত করে ভারতে প্রবেশ করে এবং বজ্রবিদ্যুৎসহ প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। মৌসুমি বায়ুর আগমনজনিত হঠাৎ বৃষ্টিপাতের ঘটনাকে মৌসুমি বিস্ফোরণ বলে।
*2. পশ্চিমী ঝঞা কী?*
উত্তর: শীতকালে ভারতে স্থলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত উত্তর পূর্ব মৌসুমি বায়ু জলীয়বাষ্পহীন থাকায় ভারতে তেমন বৃষ্টিপাত হয় না। এই সময় মাঝে মাঝে ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ভুত ঘূর্ণবাত ভারতের উত্তর পশ্চিম অংশ দিয়ে প্রবেশ করে। ফলে উত্তরভারতে ঝড়ঝঞা হয়। এই পশ্চিমী নিম্নচাপ বিশিষ্ট ঘূর্ণবাত উত্তরভারতে শীতের শান্ত আবহাওয়াকে বিঘ্নিত করে বলে একে পশ্চিমী ঝঞ্চা বলে।
*3. কালবৈশাখী কী?*
উত্তর: গ্রীষ্মকালে প্রখর সূর্যকিরণে স্থলভাগ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এপ্রিল মে মাসে গ্রীষ্মকালে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও অসমের স্থলভাগের উষ্ণ বাতাস ও সমুদ্র থেকে আগত জলীয়বাষ্পপূর্ণ শীতল বাতাসের সংঘর্ষে ফলে বিকেলে বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড় বৃষ্টি হয়, যা কালবৈশাখী নামে পরিচিত।
*4. বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল কাকে বলে?*
উত্তর: জলীয়বাষ্পপূর্ণ আর্দ্রবায়ু পর্বতের প্রতিবাত ঢালে বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে যখন পর্বতের বিপরীত ঢালে বা অনুবাত ঢালে এসে পৌঁছায় তখন জলীয়বাষ্পের অভাবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস পায়। অনুবাত ঢালে অবস্থিত বৃষ্টিহীন বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল নামে পরিচিত। উদাহরণ—ভারতের শিলং।
*5. আম্রবৃষ্টি বলতে কী বােঝাে?*
উত্তর: দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক, কেরালা ও তামিলনাড়ুতে গ্রীষ্মকালে স্থানীয় নিম্নচাপের প্রভাবে যে, বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত ঘটে, তাকে আম্রবৃষ্টি বলে। এই বৃষ্টিপাতের ফলে দক্ষিণ ভারতে আমের ফলন ভালাে হয় বলে এই বৃষ্টিকে আম্রবৃষ্টি বা Mango Shower বলে।
*6. লু কী?*
উত্তর: গ্রীষ্মকালে ভারতের উত্তর পশ্চিমে রাজস্থান, গুজরাত, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ প্রভৃতি স্থানে ভূ-পৃষ্ঠের সমান্তরালে যে উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয়, তাকে স্থানীয় ভাষায় ‘লু’ বলে। এটি অত্যন্ত উষ্ণ বায়ু (40°C – 50°C)। ‘লু’-র প্রভাবে মানুষ ও গবাদি পশু মারা যায়।
*7. ‘আঁধি’ কাকে বলে?*
উত্তর: গ্রীষ্মকালে রাজস্থানের মরুভূমি অঞলে যে প্রবল ধূলিঝড়ের সৃষ্টি হয়, তাকেই স্থানীয় ভাষায়, আঁধি বলা হয়। আঁধির গতিবেগ 50-60 কিমি/ঘন্টা। ঝড়ের প্রভাবে উষ্ণতা কিছুটা কমে।
*8. ‘আশ্বিনের ঝড়’ কাকে বলে?*
উত্তর: প্রত্যাগমনকারী মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে সামুদ্রিক বায়ুর সংঘর্ষে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে বঙ্গোপসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণবাতের সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরীয় উপকূলের রাজ্যগুলিতে প্রবল ঝড় বৃষ্টি হয়। একে সাইক্লোন বলে। পশ্চিমবঙ্গে এই ঝড় যেহেতু আশ্বিন মাসে দেখা যায়, তাই তা আশ্বিনের ঝড় নামে পরিচিত।
*9. তামিলনাড়ুর করমণ্ডল উপকূলে বছরে দুবার বর্ষাকাল হয় কেন?*
উত্তর: তামিলনাড়ু উপকূলে মৌসুমি বায়ুর আগমনের সময় জুন মাসে বৃষ্টি হয়, আবার অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে উঃ পূঃ ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনকারী মৌসুমি বায়ু বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে ফেরেল সূত্রানুসারে ডানদিকে বেঁকে করমণ্ডল উপকুলে প্রবেশ করে এবং পূর্বঘাটে বাধা পেয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
*10. ভারতে খরার কারণগুলি আলােচনা করাে।*
উত্তর: (i) বিলম্বিত আগমন: দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমি বায়ু নির্ধারিত সময়ের পরে ভারতীয় ভূখণ্ডে এলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে খরার সৃষ্টি করে।
(ii) অগ্রিম প্রত্যাবর্তন: দঃ পঃ মৌসুমি বায়ু নির্ধারিত সময়ের আগে ফিরে গেলে বৃষ্টিপাত কম হবার দরুন খরা হয়।
(iii) বৃষ্টিপাতের সাময়িক বিরতি: কোনাে কোনাে বছর বর্ষাকালের মাঝে দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত হয় না, ফলে খরার প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়।
(iv) পরিবেশ দূষণ: পরিবেশ দূষিত হলে বায়ুমণ্ডলের গড় উষ্মতা বেড়ে যায় এবং জলীয়বাষ্প ঘনীভূত না হলে বৃষ্টিপাত হয় না। ফলে খরা হয়।
*11. ভারতে প্রায়ই বন্যা হয় কেন?*
উত্তর: (i) অগ্রিম বর্ষার আগমন: নির্ধারিত সময়ের বহু পূর্বে দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমন ঘটলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বন্যার সৃষ্টি করে।
(ii) বিরামহীন বৃষ্টি: বছরে কোনাে কোনাে সময় বিরামহীন বৃষ্টি বন্যার কারণ হয়।
(iii) বর্ষাকালের অধিক স্থায়ীত্ব: বর্ষাকালের স্থায়ীত্ব বেশি হলে ভারি বর্ষণের ফলে বন্যা দেখা দেয়।
(iv) নিম্নচাপের স্থায়ীত্ব: দীর্ঘক্ষণ নিম্নচাপ অবস্থান করলে ভারী বৃষ্টি বন্যার কারণ।
(v) নদীর গভীরতা হ্রাস: নদীর গভীরতা হ্রাসের ফলে অধিক বৃষ্টিতে দুকূল ছাপিয়ে বন্যা হয়।
*12. ভারতে শীতকাল শুষ্ক কেন?*
উত্তর: (i) উষ্ণতার অবনমন: 22 ডিসেম্বর তারিখে সূর্য দক্ষিণ গােলার্ধে মকরক্রান্তি রেখার ওপর লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় উত্তর গােলার্ধে উষ্ণতার অবনমন ঘটে।
(ii) উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর আগমন: এশিয়ার উত্তরাংশে সাইবেরিয়া অংশ থেকে আগত শুষ্ক ও শীতল মৌসুমি বায়ু স্থলভাগের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জলীয়বাষ্পের পরিমান অনেক কম থাকে। এই কারণে শীতকাল বৃষ্টিহীন ও শুষ্ক প্রকৃতির হয়।
*13. ভারতের জলবায়ুতে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব আলােচনা করাে।*
উত্তর: ভারতের জলবায়ুতে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব অপরিসীম। তাই ভারতকে মৌসুমি জলবায়ুর দেশ বলা হয়। এর প্রভাবগুলি নীচে আলােচনা করা হল।
(a) আর্দ্র গ্রীষ্মকাল ও শুষ্ক শীতকাল: ভারতে গ্রীষ্মকালে আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌমুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং শীতকাল উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে শুষ্ক থাকে।
(b) ঋতু পরিবর্তন: মৌসুমি বায়ুর আগমন ও প্রত্যাগমনের ওপর নির্ভর করে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও শীত প্রশ্ন চারটি ঋতু চক্রাকারে আবর্তিত হয়।
(C) বৃষ্টিপাত: মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ভারতে 90% বৃষ্টিপাত হয়।
(d) উষ্ণতা: দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগমনে গ্রীষ্মকালের শেষে বৃষ্টিপাত ঘটিয়ে উষ্ণতা কিছুটা হ্রাস করে এবং উত্তপূর্ব মৌসুমি বায়ুর ফলে শীতের প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
(e) প্রাকৃতিক দুর্যোগ: মৌসুমি বায়ুর অনিয়মিত ও অনিশ্চয়তার জন্য অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টির কারণে কোথাও বন্যা আবার কোথাও খরা সৃষ্টি হয়।
(f) ঘূর্ণাবাত সৃষ্টি: শরৎকালে মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাগমনের সময় এবং সমুদ্রবায়ুর সংঘর্ষে বঙ্গোপসাগরে বা আরবসাগরে ঘূর্ণবাত সৃষ্টি হয়।
(g) বৃষ্টিপাতের অসমবন্টন: মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে পশ্চিম উপকূল, উত্তর পূর্ব ভারত, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি স্থানে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটে। অপরদিকে রাজস্থানের মরু অঞ্চল ও পশ্চিমঘাট পর্বতের পূর্বটালে বৃষ্টিচ্ছায় অল স্থানে বৃষ্টির পরিমাণ কম। তাই মৌসুমি বায়ুর প্রভাব ভারতের জলবায়ুতে বৃষ্টিপাতে অসমবণ্টন লক্ষ করা যায়।